Showing posts with label সুব্রত মন্ডল. Show all posts
Showing posts with label সুব্রত মন্ডল. Show all posts

Thursday, July 26, 2012

দুপুরে তরুলতা

লেখকঃ সুব্রত মন্ডল
সন্ধ্যার বিষণ্ণতা আমায় কুরে কুরে খায়। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর হাল্কা হিমেল হাওয়া যেন প্রলয়ের সংকেত বয়ে আনে। বাস ট্যাক্সি মিনি প্রতিটি যাত্রীযানই পরিপূর্ণ। নিত্য অফিস যাত্রীরা দিশাহারা। জীবনযুদ্ধের এ দৃশ্যপট আমার ক্লান্তি আরও গাঢ়তর করে। বাড়ি ফেরার কোন তাগিদ আমি অনুভব করি না। চঞ্চলা বালিকা, আধুনিকা যুবতী আর অতি আধুনিকা প্রৌঢ়ার দল নিজ নিজ দ্বীপের সীমানা মুছে আজ নতুন দ্বীপের সীমানা রচনায় ব্যাস্ত-আসন্ন বিপদের আশঙ্কায়। এক একটি যাত্রীবাহন আসে-থামে-যায়। বৃষ্টি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার দৃশ্যপট পাল্টে যায়। নতুন বৃত্ত রচনা হয়, নতুন দ্বীপ জেগে ওঠে।

হঠাৎই আমার দ্বীপে আবিষ্কার করি তাকে। এক প্রায় বৃদ্ধ লোকের ছাতার তলে তরুলতা। সময়ের ব্যবধানের স্বাক্ষর সারা দেহে। চোখে ক্লান্তি, দেহ শিথিল। মুখের কমনীয়তায় এসেছে বয়সের প্রজ্ঞা।

চোখে চোখ পড়ে। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে সে। প্রাথমিক বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে জিজ্ঞাসা করে-আপনি?

আমি বলি-আপনি?

সেকেন্ড কাটে, মিনিট কাটে, ঘন্টা কাটে-তারপর কয়েক লক্ষ আলোকবর্ষ পরে সে জিজ্ঞাসা করে-এখানে?

শব্দের জন্ম হয়। লিপি-ভাষা-ব্যাকরণ-অভিধান। আমি প্রয়োজনীয় শব্দ খুঁজে পাই না। পরীরা আসতে শুরু করে।

তখন অনেক পরী আসত। লাল পরী, নীল পরী, হলুদ পরী। আমার স্কুলের মাঠ পেরিয়ে রায়েদের বাঁশ বাগান ছাড়িয়ে ছিল জলার মাঠ । সারি সারি লাউ পালঙের বাগান। সেখানে লালুদের কিছু জমি ছিল। সে সুবাদে আমরা ছিলাম জমিদার। আমি লালু আর শক্তিপদ অবাধ রাজত্ব করতাম।

রাত্রি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাঁদ আসত। আমার হাত ধরত। আমি জলার মাঠে খেলা করতাম। একে একে হাজির হত আমার প্রিয় সখীরা। লাল পরী আসত নেচে নেচে পেখম মেলে আগুন রঙা উড়নি গায়ে। মেঘের সঙ্গে লুকোচুরি করত নীল পরী। আর সবশেষে আসত হলুদ পরী-ঠিক ভোর বেলায়। তখন লাল আর নীলের চোখে ঘুমের ছোঁয়া। তীব্র সুন্দরী হলুদ পরী ঝাঁঝালো আলোয় আলোকিত করে তুলত জলার মাঠ । আমার গ্রন্থিরাশি আস্তে আস্তে আলগা হয়ে আসত। সিক্ত স্বপনে আমি আবিষ্কার করতাম হলুদ পরীর মুখ-সে ছিল তরুলতা।

আমি বলতেই লাফিয়ে উঠল শক্তিপদ। বলল-তুই লোভে পড়েছিলি। প্রথমে আস্বীকার করি। দেহে এক অজানা অনুরণন আসে। মুখ নীচু করি।

একে লোভ বলে, দেখ তোর মুখ লাল হয়ে উঠেছে। লালু বিজ্ঞের মত মন্তব্য করে।

আমি সাংঘাতিক ভয় পাই। বাবার মুখটা ভেসে আসে। পরিণামের কথা চিন্তা করে দেহ শক্ত হয়।

তখন এই ছোট শহরে আমাদের একমাত্র পরিচিত প্রেমিক ছিলেন গনাদা। বছর পঁচিশ বয়স। সুপুরুষ। ইঞ্জিনিয়ার। ওঁর প্রেম শহরের তাপমাত্রা অনেকদিন উঁচু স্কেলে বেঁধে রেখেছিল। আমাদের মত নতুন গোঁফ-ওঠা কিশোরদের কাছে গনাদা ছিলেন আদর্শ। যখন সন্ধ্যা বেলা সদ্য ভাঙা তুষাররঙা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে তিনি আমাদের পাশ দিয়ে যেতেন, আমরা ভাষা হারিয়ে ফেলতাম। ফেলে যাওয়া হাল্কা সেন্টের গন্ধ আমাদের অবিষ্ট করত। শক্তিপদ বলত-টিউশনি যাচ্ছেন। আমি বলতাম-অনুরাধার কাছে। অনুরাধা ছিল গনাদার প্রেমিকা। ক্লাস টেনে পড়া লম্বা বিনুনীর এক ভীরু বালিকা। বাবা রেলের গুডস ক্লার্ক। ব্যাপারটা তিনি জানতেন। হয়ত নীরব সমর্থনও ছিল। যা কিছু আপত্তি ছিল গনাদার বাড়ির দিক থেকে। ঠিকযেমন জমাটি নাটকে হয়। ঘটনার টানাপড়েনে শহরে মাঝে মাঝেই ঢেউ উঠত।

গনাদার একছত্র প্রেমের রাজত্বে আর একজন দ্বিতীয় প্রেমিকের প্রবেশ যে শহরকে তোলপাড় করে দেবে তা আমি জানতাম। আসলে সময়টা তখন এত জটিল ছিল না। দূষণ শব্দটি নেহাতই প্রয়োজনে ব্যবহার হত। অর্থাৎ জল, বায়ু, শব্দ এমনকি সংস্কৃতির পরে এটিকে লাগানোর দরকার পড়ত না। কিশোর জগৎ তখন উত্তম সুচিত্রার দখলে। শক্তিপদ আর লালু স্কুল পালিয়ে এগারোবার দেখে এসেছে। সেই অসাধারণ প্রেমের বর্ণনায় আমি দিশাহারা। আমরা ক্লাস ইলেভেনে পড়ি। ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চে লালু তার অননুকরণীয় কন্ঠে মৃদুস্বরে গান শোনাল-ওগো তুমি যে আমার। তারপর একটা চোখ টিপে অর্থবোধক হাসি হাসল। আমি সমঝদারের ভঙ্গীতে আর একটা চোখ টিপে উত্তর দিলাম।

হঠাৎবাঘাটে গলায় চিৎকার-চমকে উঠি - অতনু স্ট্যান্ড আপ। অংকের মাস্টারমশাই অশোকবাবু আগুন ঝরা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। উঠে দাঁড়ালাম।

-কাল্পনিক সংখ্যা কাকে বলে?

সংখ্যাত্ত্বের সব সংখ্যাই আমার জানা ছিল। কিন্তু এর মধ্যে যে কোনটি কাল্পনিক তা আমি কল্পনায় আনতে পারলাম না

- মিত্তির স্ট্যান্ড আপ।

লালু মুখের মধ্যে শিশুর সরলতা মিশিয়ে উঠে দাড়ায়।

- গায়কটি কে?

- অতনু স্যার। লালু আমার দিকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দেয়। কথাটার মধ্যে অবিশ্বাসের কিছু ছিল না। কারন ক্লাসের মধ্যে আমিই ছিলাম প্রতিষ্ঠিত গায়ক।

- অতনু। নিল ডাউন ফর রেস্ট অফ দা পিরিয়ড। তারপর অশোকবাবু আমার কল্পনাকে খান খান করে দিয়ে কাল্পনিক সংখ্যা বোঝাতে লাগলেন।

তুই প্রেমে পড়েছিস- শক্তিপদ আবার বলল। কি সাঙ্গঘাতিক ব্যাপার! রায়েদের বাড়ির দুধরঙের মেয়ে তরুলতাকে প্রেম। আমার মাথা রিমঝিম করে। এ ধরনের চিন্তা আমার মত আধা-শহুরে কিশোরের পরিপাক করা শক্ত ছিল। কারন তখন সামান্য উপকরনই আমার যৌন চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে রাখত। পরিচিতা, আত্মীয়ার অন্তর্বাসের এক ঝিলিক দেখা, গুপ্ত প্রেস পঞ্জিকার বৃহৎ রাঙামুলোর বিঙ্গাপন কিংবা বই পাল্টানর সময় অপর্নাদির আঙ্গুলের একটু ছোঁয়া আমার কাছে অজানা রাজত্বের চাবিকাঠি ছিল। কিন্তু গোটা রাজত্বের অধিকার সম্বন্ধে আমি নিজেই সন্দিহান ছিলাম। বললাম তাই হয় নাকি? এতো স্বপ্ন। যে কেউ দেখতে পারে।

শক্তিপদ রেগে গেল। বলল- জগতে এত মেয়ে থাকতে তুমি তরুকেই বা স্বপ্নে দেখতে গেলে কেন? ন্যাকামি ছাড় তো বাবা। ডুবে ডুবে জল খাওয়া হচ্ছে?

- তুই তো সায়রাবানুকে স্বপ্নে দেখলি, তার মানে সায়রাবানু তোর লাভার হয়ে গেল।

- বোকা, বোকার ডিম। সায়রাবানু হিরোইন। হাজার হাজার লোক স্বপ্নে দেখে। কিন্তু তরু? তরুলতাকে একমাত্র স্বপ্নে দেখে আমাদের অতনু। শক্তিপদ প্রান খুলে হাসতে থাকে।

তুই ঘাবড়াচ্ছিস কেন? যাতে একটা হিল্লে হয় দেখছি। শক্তির সাথে একটা প্লান করতে দে। লালুর গলা আত্মবিশ্বাসে ভরপর।

শক্তিপদ ভাল মানুষের মত বলল-ক'দিন রোদে বেরোস না, আর 'লা বেলা' সেলুনে ঘাড়টা গোল করে ছেটে আয়।

আমি খোলসে প্রবেশ করি, যাতে স্মরণে-মননে হলুদ পরী হারিয়ে না যায়। বিকেলে খেলার মাঠে যাওয়া ছেড়ে দিলাম। লাল কর্ডের প্যান্টটা বার করলাম। সঙ্গে সানিটের সার্ট। কড়া করে মাড় দেওয়া। ঘড়িওয়ালা মোড়ে দাঁড়াই।

সেন্ট মার্গারেটের বাস আসে এ শহরে অর্ধেক সুন্দরীকে নিয়ে। চাঁপারঙের স্কুল বালিকারা একে একে নামতে থাকে। মুখে ছুটির আনন্দ। সবশেষে নামে তরুলতা। কচি কলাপাতা রঙের স্কুল ইউনিফর্ম, সাদা মজা,পায়ে কেডস। ভীরু চোখে এস্ত হরিণীর মত যাত্রা করে বাড়ির দিকে। কোনদিকে দৃষ্টিপাত না করে।

এক কিশোর মুগ্ধ বিস্ময়ের স্থবির হয়ে যায়। তারপর ভয়ংকর বয়সের অস্থির যন্ত্রণায় সে ছটফট করে। সে যন্ত্রণা পোষাকের বাধা মানে না। সভ্যতা, ভব্যতা, নীতি, রুচি ইত্যাদি শব্দগুলোকে কামান দাগতে থাকে। মনে হয় শহরের সব কটা মাইক ভাড়া করে ঘড়িওয়ালা ঘোড়ে লাগিয়ে দেয়। বলতে শুরু করে-তরু-তরু-তরুলতা।

বৃষ্টির তেজ কমে আসে। আমি জিজ্ঞাসা করি-আপনি এখানে? তরুর চোখে নিভন্ত প্রদীপের আলো। জবাব দেয়-ক্যামাক স্ট্রীটে একটা ক্রোশে কাজ করি। ছটায় ছুটি। বৃষ্টিতে আটকে গেছি। আমি বলি আশ্চর্য! আমিও তো ক্যামাক স্ট্রীটে ন্যাশনাল ব্যাঙ্কে কাজ করি। একদিনও তো আপনির সঙ্গে দেখা হয়নি।

পৃথিবীতে তো কত আশ্চয়ই থাকে, আমি-আপনি কতটুকুই বা জানি? তরু ম্লান হেসে জবাব দেয়। তারপর বলে-প্রায় একঘন্টা দাঁড়িয়ে আছি, কোন বাসে উঠতে পারছি না। আমায় একটু পৌঁছে দেবেন! কোন সুদূর অজানা দেশ থেকে ইহার তরঙ্গে ভেসে আসে-আমায় একটু পৌঁছে দেবেন। আমি তরুকে নিয়ে চলতে থাকি। জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন বোধ করি না-কোথায়?

সকালে শহরে হৈ চৈ পড়ে যায়। কারা যেন সারা বছর দেওয়ালে লিখন ভরে দিয়েছে। অতনু+তরু। কোথাও বাদ রাখেনি। শীতলা মন্দিরের চাতাল শ্যামশ্রী সিনেমার প্রস্রাবাগার, করিম মিঞার মাংসের দোকান, এমনকি তরুদের বাড়ির দেওয়াল। একঘন্টার মধ্যে খ্যাতির পাদপ্রদীপে চলে আসি। বাবা দুগালে সপাটে চপেটাঘাত করেন। ক্রন্দনরত মা আমার কর্ডের প্যান্ট আর সার্টিনের জামা আলমারি বন্দী করেন। পচা নাপিত এসে আমার মাথায় রোলার চালিয়ে দেয়।

বিকালে লালু আর শক্তিপদ এসে হাজির হয়। আমি কান্নাভেজা কন্ঠে বলি - তোরা বন্ধু হয়ে এত বড় সর্বনাশ করলি। লালু অবাক হওয়ার ভান করে- উপকার বল! ভিত আমরা করে দিয়েছি। মহল গড়ার দায়িদ্ব তর। শক্তিপদ বলে- তরু এখন জানে তুই ওকে ভালবাসিস। এবার তর জিনিষ তুই বুঝে নে। আমি রাগত সুরে বলি- আমি আর এসব ব্যাপারে নেই। তদের জন্য আমার এই বদনাম। লালু ক্ষেপে গিয়ে বলে- বদনাম। প্রেম করবে বদনাম হবে না, ক্ষির খাবে- গোঁফে দাগ লাগবেনা, তবে শাড়ি পরে ঘোমটা দিয়ে যাত্রা নাচো। শক্তিপদ বলে- আমরাও এর মধ্যে নেই, আর কোনদিন আমাদের কাছে মিনমিন করতে এস না।

স্বাভাবিক নিয়মেই ক'দিন পর ঢেউয়ের তীব্রতা কমে আসে। বিকেল হলেই ঘড়ি মোড় আমায় নেশার মত টানে। একদিন নানা গুপ্তচরের চোখ এড়িয়ে চলে আসি। এক্টু দুরে দাড়িয়ে সময়ের অঙ্ক কষি। হটাৎ এক ঝাঁক মুনিয়ার ডাকে চমকে যাই। ওরা বাস থেকে একে একে উড়ে আসে। তরুকে দেখি। ও আমায় দেখে। দৃষ্টির শীতলতায় আমার ব্যারমিটারের পারা দ্রুত নামতে থাকে। ক'হাত দুরে আবিষ্কার করি তরুর মাকে। চখে বাঘিনীর হিংস্রতা। যে কোন মুহুর্তে রক্তপাত হতে পারে। একপাটি হাওয়াই ছিটকে চলে যায় নর্দমায়। আর একপাটি নিয়ে দিই ভোঁ দৌড়।

আমাকে অবাক করে একদিন শহরের প্রতিষ্ঠিত প্রেমিক গনাদা জিঞ্জাসা করলেন- তোমার নাম অতনু না ? আমি মুখ নিচু করে জবাব দিই- হ্যাঁ। তারপর কোন ভুমিকা ছাড়াই বললেন- তুমি তরুকে ভালবাসো? চুপ করে থাকি, কি জবাব দেব ভেবে পাই না।

- তুমি ভালবাস। তোমার মুখ তাই বলে। তারপর কি ভেবে আবার প্রশ্ন করেন- তরুকে জানিয়েছ, তোমার মনের কথা?
- না
- কেন ?
- লজ্জা করে, ভয় লাগে।
- ভয় পেলে প্রেম করা চলে না, মেয়েরা সাহসী ছেলে পছন্দ করে।
- বাবা বলেছেন বাড়ি থেকে বার করে দেবেন।
- তা হলে তোমার প্রেম করা উচিত হয়নি।
- কিন্তু আমার যে তরুকে ভাল লাগে!
- বেচারা! গনাদা মৃদু হেসে পিঠ চাপড়ে দেন। তারপর বলেন,
- দেখি তোমার জন্য কি করতে পারি।

কি আশ্চর্য! দু-মাস পরে দেখি গনাদা তরুকে পড়াতে আরম্ভ করেছেন। লালু বলে- এবার তোর একটা হিল্লে হবেই। এ ব্যাপারে গনাদার প্রচুর অভিজ্ঞতা। ভরসা রাখা যায়।

আমি ভরসা রাখি। দিন যায়। লালু মাঝে মাঝে খবর আনে। প্রায়ই সন্ধ্যাবেলা পাঁচিলের ধার থেকে গনাদার পড়া দেখে। একদিন এসে বলে- আজ দেখলাম গনাদা রোমিও-জুলিয়েট পড়াচ্ছেন।

কি অপুর্ব আবৃত্তি। সারা ঘর গম গম করছিল।
- আর তরু? আমি প্রশ্ন করি।
- তরু? তরু এক মনে বাঁগালে হাতদিয়ে শুনছিল।

আর একদিন এসে বলে- আজ বৈষ্ণব পদাবলি শুনলাম। রাধার মানভঞ্জন।

শক্তিপদ আশ্চর্য হয়ে বলে- ইংলিশ মিডিয়ামে এ সব পড়ানো হয় নাকি? আমি বলি- হয় হয় সব হয়। ভাল মেয়েরা রেফারেন্স হিসাবে সব কিছু পড়ে।

আবার খবর আনে। তরুকে সে কাঁদতে দেখেছে। গনাদা বকেছে। বোধ হয় পড়া পারেনি। আমি ব্যাথিত হই। গনাদা বকেছে। তরু নিশ্চই রাতে কিছু খায়নি। আমি সে রাতে এক গ্লাস জল খেয়ে শুয়ে পড়লাম। মা বারবার ডাকাডাকি করল।
- শরীর খারাপ, বিরক্ত কর না, বলে পাশ ফিরঅলাম।

একদিন বাজারে গনাদাকে পাকড়াও করি।
- গনাদা, আমার কি হল?
- আরে অতনু না? বলে আমার কাঁধে হাত রাখেন।
- অনেক দিন হয়ে গেল, কি খবর গনাদা?
আমার করুন কন্ঠে আর্তি।
- ও তরু? তাই বল। এত তাড়াহুড়ো করলে কি সবকিছু হয় ভাই? সময় লাগে, সময় লাগে।
- আর কতদিন গনাদা- আমি আর্তনাদ করি।
- বোকা ভাইটি। একি বেগুনী-ফুলুরি নাকি? দোকানে গেলে আর কিনে আনলে। এর নাম প্রেম। শুধু জমি তৈরি করতেই বছর ঘুরে যায়।
- জমি? অবাক হই।
- হ্যাঁ জমি! আমি তৈরি করি তুমি ফসল তুলো। গনাদা প্রান খুলে হাসতে শুরু করেন।

আমি বোকার মত চেয়ে থাকি। গনাদা বলেন- এ সব তুমি বুঝবে না, শাস্ত্রীয় ব্যাপার। সময় হলে সব জানাব।

সব শুনে শক্তিপদ ক্ষেপে গেল। চেঁচাতে লাগল- আমার এ সব ভাল লাগছেনা। গনাদা কিছু চাল চেলেছে।
- আমার ও তাই মনে হয়, লালু বলে।
- তুই গনাদার কাঁধে মই দিয়েছিলি কেন? পুরুষ মানুষ একা লড়তে পারিস না? শক্তিপদ রাগে ফুঁসতে থাকে।
- তুই যদি সত্যি ভালবাসিস, তরুকে সোজাসুজি জানা। আমি দপ করে জ্বলে উঠি - জানাবটা কি করে? মাত্র দুবার বাড়ির বাইরে দেখি। একবার স্কুলে যাবার সময় আর একবার ফেরার সময়। আর সব সময় ওই মেয়েমানুষটা ঘিরে ঘিরে রাখে।
- অতনু। শক্তিপদ ধমক দেয়। তারপর বলে- নিজের গুরুজন সম্বন্ধে ওরকম অসভ্য কথা বলতে নেই। শোন, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলেছে। তরু রোজ রাত নটা নাগাদ পুবের বারান্দায় আসে। চুল আঁচড়ায়। আমি পিসির বাড়ি যেতে গিয়ে দেখেছি।
- তাতে কি? লালু বিরক্ত হয়।
- আমাকে বলতে দে, তারপর অতনু একটা চটঠিতে ওর মনের সব কথা জানাবে। আর চিঠিটা গুলতিতে একটা ঢিলের সঙ্গে বেঁধে ফেলে দিলেই চলবে। শক্তিপদ ঝড়ের বেগে কথাগুলো বলে যায়।
- কেল্লা ফতে- লালু চিৎকার করে ওঠে।

প্রিয়তমা তরুলতা। দুবার কাটাকুটি করি। না, শুধু তরুলতাই থাক। সারা জীবন তমার ক্ষতিই করে গেলাম। বিশ্বাস কর, আমি যা করেছি তা শুধু তোমায় ভালবেসে। জানি, তুমি আমায় ভালবাস না। কিন্তু আমি তো বাসি, চিরকালই বাসব। সেয় যবে আমার ভুরু হবে তোমার গায়ের রঙের মত- সেদিনও তোমায় ভালবাসব। আমার দিকে একটু তাকিও। না অমন করে নয়, ঠিক হলুদ পরী যেমন করে তাকায় তেমনি করে। অবাক লাগছে না? যদি কোন দিন সুযোগ পাই খুলে বলব। না হয় হলুদ পরীকেই জিজ্ঞেস কোরো। একটু বাদেই তো পরীর দেশে যাবে। শুভরাত্রি- অতনু ।

ঠিক রাত্রি সাড়ে আটটায় আমরা 'অভিযান- তরুলতাস' বেড়িয়ে পড়ি। লালু সাইকেলে, আমি আর শক্তিপদ হেঁটে। শহরের শেষ সীমায় এ জায়গাটা প্রায় নির্জন। দু-এক জন লোক দেখা যায়। রাস্তার মোড়ের একটা টিমটিমে আলো ঘন অন্ধকারকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। নিজের অজান্তে শক্তিপদর হাত চেপে ধরি। ও নিঃশব্দে আমার হাতে গুলতি তুলে দেয়। তারপর আমাদের দাঁড় করিয়ে হটাৎ অন্ধকারে হারিয়ে যায়।

লালু আর আমি অন্ধকারে গোঁজ হয়ে বসে থাকি। মশার কামড় খাই কিন্তু মারতে সাহস হয় না- পাছে আওয়াজ হয়। শক্তিপদ ছুটতে ছুটতে আসে। তারপর বলে তরু এসে গেছে, ছুটে যা।

অস্ত্রে শাণ দিই। একটা গোলমত ইঁট তুলে নিই। যত্ন করে চিঠিটা ইঁটে জড়াই। তারপর আস্তে আস্তে রওনা দিই তরুসুন্দরীর দিকে। আজকের অভিযানে ভয় পাই না। কারন পাওয়া কিংবা না পাওয়া এই সরল অথচ আপাত জটিল সমস্যার সমাধান করে দেবে এ অভিযান। আমি নির্বিকার চিত্তে এগিয়ে যাই।

পুবের বারান্দায় তরু দাড়িয়ে। পরনে লম্বা হাউস কোট। গায়ের রঙের। অপরুপ ভঙ্গির সেই কেশ প্রসাধনে ফুটে উঠে নৃত্যের মুদ্রা। আমি স্তব্ধ হই। জোনাকিরা মিটিমিটি আল জ্বেলে পুজো করে- তাদের প্রিয় দেবীকে। প্রানভরে পান করি সেই অপার্থিব রুপসুধা। আমার মরনে খুঁজে পাই জীবনের সব সুখ। ভুলে যাই আমার অভিযান। আর এগিয়ে গেটের কাছে চলে আসি। ভাল করে দেখার জন্য।

হটাৎ তরু আমাকে দেখতে পায়। চিৎকার করে ওঠে কে? কে ওখানে?
আমি চকিতে গান্ডীবে টান দিই। আর্তনাদ ভেসে আসে- মাগো! মেরে ফেলল! দেখি তরু মুখ ঢেকে বসে পড়েছে। অনেক কন্ঠের চিৎকার ভেসে আসে।

দৌড় দিই। জীবনের সেরা দৌড়। লালু শক্তিপদ দাঁড়িয়ে। আমি কাছে এসে বলি- পালা, তরুকে মেরে ফেলেছি। ওদের হতচকিত করে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আবার দৌড়তে থাকি। পেছনে অস্পস্ট কোলাহল শুনতে পাই। সাঁ সাঁ করে সাইকেলে লালু আর শক্তিপদ আমায় ফেলে চলে যায়।

আমার কোন গন্তব্যস্থল নেই। কোন লক্ষ্য নেই। নিজের অজান্তে কখন হাজির হই গনাদার বাড়িতে। এতরাত্রে আমায় দেখে গনাদা অবাক হন। তারপর জিজ্ঞাসা করেন- হাঁফাচ্ছ কেন? কি হয়েছে?

- আমি তরুকে মেরে ফেলেছি। ভয়ে কুঁকড়ে যাই। গনাদা একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। তারপর কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে বলেন- কি হয়েছে, ঠিক ঠিক করে বল।

গোটা ব্যাপারটা বলি। সব কিছু। কিছু বাদ না দিয়ে।
- তুমি এখানে বস। আমি যতক্ষন না আসি বাইরে পা দেবে না। গনাদা সাইকেলে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে যান।

আমি অকৃতকার্য। আমার কোন অনুভুতি নেই। ফেল করার ভয়ে আর আমাকে কুঁকড়ে থাকতে হবে না। কিছু হারানোর ভয় নেই। কারন আমি হারিয়ে ফেলেছি। নিজের অজান্তে গনাদার বিছানায় দেহটা এলিয়ে দিই। কতক্ষন ঘুমিয়ে ছিলাম জানিনা, গনাদার দাকে ঘুম ভাঙে।
- উঠে বস। তরুর কপালে তিনটে স্টিচ হয়েছে। চোখটা খুব জোর বেঁচে গেছে।

আমি শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি।
- তোমার চিঠি তরুর মা পেয়েছে। কাল থানায় ডায়েরি করবে।

আমি গ্রিক ভাষা বুঝি না। কোন দিন শিখিনি।
- তোমার বাবাকে খবর দিয়েছি। সকালে বাড়ি যেও।
আমি ফ্রেঞ্চ জানি না। আমি ক্লান্ত, শুয়ে পড়ি।

বাবার ব্যক্তিগত মুচলেখা, তরুদের বাড়িতে মায়ের ঘন ঘন গমন এবং ক্ষমা প্রার্থনা- আমার কোর্ট ঘর থেকে বাঁচিয়ে দিল। আমি প্রেমরোগ মুক্ত হলাম। কলকাতায় এসে কলেজে ভর্তি হলাম।

এর পরের দৃশ্যগুলি খুব দ্রুত অভিনীত হতে লাগল। পুজোয় বাড়ি এসে শুনলাম তরুর বিয়ে গনাদার সঙ্গে। অবশ্য নতুন কিছু খবর নয়। এটা জানতাম। শাস্ত্রজ্ঞ প্রেমিক গনাদাকে ধরা রাখার ক্ষমতা নেই অনুরাধা নাম্নী ভীরু বালিকার ছিল না।

পথে ঘাটে মাঝে মধ্যে ওদের দেখতাম। তরু সুখি বিড়ালীর মত স্ফীত হতে লাগল। বাতাসে সুগন্ধ ছড়িয়ে রিক্সায় দুজনে হুস করে চলে যেত। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে ভাবতাম এ রকমই বুঝি সুখের চেহারা। আমার মনে কোন দুঃখ ছিল না। দেবদাস হবার ইচ্ছাও ছিল না। অক্ষমতার ক্রোধ সময়ের ব্যবধানে তেজ হারিয়ে ফেলেছিল।

গরমের ছুটিতে এসে মনটা খারাপ হয়ে গেল। শক্তিপদ বলল- গনাদা একটা স্কাউন্ড্রেল। আমি চমকে উঠি। গনাদা নাকি আবার অনুরাধার কাছে যাতায়াত শুরু করেছে। এ নিয়ে খুব অশান্তি। তরুর বাবা-মা আর নেয়। দাদাদের পৃথক সংসার। তা সত্ত্বেও তরু প্রায়ই দাদাদের কাছে চলে আসে।

তারপর থেকে বাড়ি এলেই তরুর খোঁজ করতাম লালু কিংবা শক্তিপদর কাছে।

লালু বলল- তুই জানিস না? তরু আর এখানে থাকে না। কলকাতায় কোন লেডিস হোস্টেলে থাকে। ওর দাদাই বন্দোবস্ত করে দিয়েছে। গনাদা ফের অনুরাধাকে বিয়ে করেছে।

বৃষ্টি থেমে গেছে। সন্ধ্যার বিষন্নতা কেটে এখন আকাশ মেঘমুক্ত। চাঁদ প্রলয়ের স্মৃতি মুছে দিতে মিটি মিটি হাসে। কখন তরুর হাথ আমার হাতে ধরা দিয়েছে আমি নিজেই জানি না। আমি এগিয়ে চলি।

সমাপ্ত

যুদ্ধপর্ব

লেখকঃ সুব্রত মন্ডল
এক
করুণাবাবুকে মেরে ফেলাই ঠিক হল। সবাই প্রায় এক মত। দু-চারজন মৃদু প্রতিবাদের চেষ্টা করে। বিশেষ করে যারা ওঁর ছাত্র ছিল। অবশ্য তাদের প্রতিবাদ জোরালো হবার সুযোগ পায়নি ভয়ে। আমরা দালাল, প্রতিক্রিয়াশীল এ সব শব্দগুলোকে ভীষণ ভয় করতাম। ব্যাপারটার সর্বসম্মত রূপ দেবার চেষ্টা হয়নি যে তা নয়। ভোটাভুটি হয়। আমি মাথা নিচু করে হাত তুলি। মিশ্রজীর গোয়ালে খাটিয়া পেতে বসেছিলাম। জমাট অন্ধকার। জোনাকির আলোয় গরুর চোখগুলো শুধু চকচক করে। জায়গাটা মুক্তাঞ্চল বললে ভুল হয় না। চারিদিকে মাকড়সার জালের মতো কটা পুরানো গুদাম ঘর। কাছাকাছি দুটো লম্বা দৌড়ের রাস্তা। একটা গঙ্গার পাশ দিয়ে সরকারি মালখানায় ঢুকে পড়ে, গেটে লেখা বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ, আর একটা রেল লাইন ধরে যেতে জি টি রোডে থমকে দাঁড়ায়। দেশি মদের মত চরিত্র এ পাড়ার। অল্পতেই ঝাঁঝ। বাতাসে বিষ্ঠার গন্ধ। বোতলের হাল্কা ঝাঁকুনি বুদবুদের মত ফেটে পড়ে, সকালের জলের লাইন। খিস্তি, খেউড়, চেঁচামেচি, বালতির আওয়াজের কনসার্টের যোগ দেয় এক পাল পাকাদাড়ির মিস্তিরি, পলকা মজদুর আর কাঁচুলিতে শাড়ি জড়ানো কটা সস্তা বেশ্যা। শব্দ ব্রহ্ম চারদিকে ভোঁ ভোঁ করে। লরি থেকে মাল খালাসের আওয়াজে পায়ের তলার মাটিতে কাঁপন লাগে। ঝাঁকে ঝাঁকে কুকুরের দমফাটা চিৎকারে কান ঝালাপালা। তবু এটা আমাদের নিশ্চিত আশয়। কবুতরের বুকের মতো নরম আর উষ্ণ।

করুণবাবু ঝুঁকো চেহারা নিয়ে নিজেই এক জিজ্ঞাসার চিহ্ন। ষাটের তোবড়ানো মুখ, চোখে বোতলের কাচ। পৃথিবীর সব ঘটনার ন্যায়-অন্যায়ের একনিষ্ঠ বিচারক। সাত-এর দশকে এ ধরণের লোক মাঝে মধ্যে মিলত। বোকা মাস্টার, ভীতু কেরানি, ধুতি পরা ডাক্তার সব পাড়াতেই দু একজন উঁকি ঝুঁকি দিত। কিন্তু এটাই শেষ দশক। তারপর ডোডো পাখি। ফুটে আমি আর দেবু। চেয়ারম্যানের নামে ধবনি দিয়ে মূর্তি ভাঙছিলাম।

জেলা অফিসের সামনে ছোট ফুল বাগিচা। মাঝে পলেস্তারাহীন পিলারের উপর খর্বাকৃতি বঙ্গ সন্তানের মূর্তি। সুবিশাল কপাল, গায়ে চাদর, গলায় শুকনো মালা। ফুটে মাথায় হাতুড়ি চালায়।

কোথা থেকে ভোজবাড়ির মতো করুণাবাবুর উদয়। উনি গলার শিরা ফুলিয়ে ছাতি বাড়িয়ে তেড়ে এলেন। জায়গা দ্রুত ফাঁকা হয়ে যায়। কালেক্টার অফিসের জানালার ফাঁক দিয়ে কটা কৌতুহোলী মুখ-বিনে পয়সার সার্কাস।

ফুটে এক ধাক্কায় করুণাবাবুকে সরিয়ে দিয়ে পাইপগান তাক করে। ওর একটা চোখ পাথরের। সব সময় অর্ধেকটা বেরিয়ে থাকে। আর একটা স্থির, ঠিক মরা ভেটকির চোখের মতো। আমি পাইপটা চেপে ধরে বলি-মারিস না মাইরি।

ও জ্যান্ত চোখটা নাচিয়ে বলে-শালা দালাল, বড়লোকের দালাল। একদম জালি মাল।

-মাইরি বলছি, না। আমার স্কুলের মাস্টার মশাই, ছাপোষা লোক। পাইপটা হাতের তালুতে আটকে রাখি।

ততক্ষণে করুণবাবু নিজেকে সামলে নেন। চশমাটা মাটি থেকে তুলে আমার দিকে এগিয়ে আসেন।

-বাবা অভিষেক না? ভাল, তা ভাল। এটা কি ন্যায্য কাজ? তুমি এর কাছে ঋণী, তোমার বাপ-ঠাকুরদা ঋণী। স্যারের হাতে পরম বিস্ময়ে ধরা থাকে আমার দুটো হাত।

দেবু এগিয়ে আসে। স্যারের ডান হাতটা সাঁড়াশির মত চেপে ধরে বলে-লেকচার দেবেন না, আমরা লেখাপড়া জানি। মনে রাখবেন, আপনাদের মতো মাস্টারই আমাদের তৈরি করেছে। উত্তেজনায় ওর মুখ রাঙা হয়ে ওঠে।

কথাটা মিথ্যা নয়। ও ছিল বিশুদ্ধ গণিতে ইউ জি সি স্কলার। স্কুলের শেষ পরীক্ষাবৃত্তি প্রাপকদের একজন। একদম ননী থেকে তোলা ননী। তবু আমরা লেখাপড়া জানি কথাটা কানে খচ করে লাগে। কোথায় যেন একটু বেদনার সুর, একটু হতাশার ছোঁয়া।

দেবু স্যারকে জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, অস্বীকার করেন?

-না বাবা অস্বীকার করি না, দায়িত্ব আমি এড়াই না। কিন্তু তুমি যে ভাষায় কথা বলছ, যে দায়িত্ববোধ তুমি লেখাপড়া করে পেয়েছ-তার কিছুটা তো এঁরই দেওয়া।

ফুটে ফিস ফিস করে-শালা জ্ঞান পাপী, দিই উড়িয়ে।

আমি ফুটের হাত চেপে ধরি। বলি, স্যার, আপনি বোধহয় আমাদের ছাত্র ভেবেছেন।

এ উপদেশ গত একশো বছর ধরে কত লক্ষ ছাত্র শুনেছে? কি লাভ হয়েছে বলুন? ঘর থেকে বেরিয়ে আসুন। ভাল করে চোখ মেলে চান। অনেক কিছু জানার আছে।

ফুটে চোখের নিমেষে আমার হাতটা সরিয়ে দেয়। গুলি করে। হাতের ধাক্কায় গুলি নিশানা হারিয়ে বাগানের রেলিঙে লাগে। আমি ঝাঁপিয়ে পড়ি ফুটের উপর- মারিস না, স্যারের পাঁচ মেয়ে। ছোটটা মুন্নি। একটারও বিয়ে হয়নি। মরে গেলে ঘোলাডাঙায় লাইন দেবে। পাইপটা তলপেটে চেপে ধরি।

ফুটের সাথে দেবুর দৃষ্টি বিনিময় হয়।

-ওরে শালা লাভার। দেবুর চোখে একরাশ ঘৃণা।

ফুটে আমার কলার চেপে ধরে। পাইপটা গলায় ঠেকায়। যেন পোষা কুকুরের জিভের আদর। ভীষণ ঠান্ডা আর নরম। ওর জ্যান্ত চোখের হলুদ মণিটা থির থির করে কাঁপে। মায়ের মুখ, মুন্নির মুখ- ঘন এলাচির গন্ধ পাই। কী ভীষণ যে বাঁচার ইচ্ছা জাগে। আমায় মারিস না ভাই।

-ফুটে পুলিশ। দেবু চাকিতে পাইপের মুখটা সরিয়ে দেয়। চোখ চাই। কালেক্টার অফিসের জানালাগুলোয় ঝটপট আওয়াজ। দূরে একটা কালো গাড়ি। বুক ভরে নিশ্বাস নিই।

পরের দিন আমাকে তপেনদার কাছে যেতে হল। তপেনদা খাটিয়া থেকে উঠে দাঁড়ান। উনি আমাদের তাত্ত্বিক নেতা। এক সময়ের জীব রসায়নেরও সেরা ছাত্র। ওঁর ত্যাগ সবসময়েই আমাদের প্রেরণা দেয়। পোড় খাওয়া সংগ্রামী। বিড়িতে লম্বা টান দেন। মুখে সযত্নে আড়াল করা যন্ত্রণার ছাপ। ঝকঝকে চোখের কোণে এক চিলতে বেদনার আঁচড়-অনেক কষ্টে লুকিয়ে রাখা। এ যন্ত্রণাময় মুখ আমি আগেই দেখেছি, ছেলেবেলায় বাবার সঙ্গে সার্কাসে। ক্লাউনের মুখ। চোখটাও আমার চেনা। মা যখন ছোটনকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে এলেন, দু-এক দিন পরেই হাজির হল তিনটে হিজড়ে। ঢোলক নিয়ে কত নাচনকোদন। বাবা পঞ্চাশ টাকা দিলেন। ওরা তখন হাসছিল। আমি ওদের চোখ দেখেছিলাম। সেই এক চোখ।

দু'বার গলা খাঁকারি দিয়ে তপেনদা বলতে শুরু করেন ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় করুণাবাবু একজন দালাল। ধনিক শ্রেণীর। অভিষেক তাকে বাঁচিয়ে পার্টি-বিরোধী কাজ করেছে। আমরা আরো খোঁজ নিয়েছি, ওঁর ছোটমেয়ের সঙ্গে অভিষেকের ভালবাসা ছিল বা আছে। ও নিজের স্বার্থকে পার্টি আদর্শের ওপরে স্থান দিয়েছে। আমি উপস্থিত বিপ্লবী বন্ধুদের অনুরোধ জানাই তারা তাদের সুচিন্তিত মতামত জানান। তপেনদা আমার চোখ এড়িয়ে সবার ওপর চোখ বুলিয়ে নেন।

হঠাৎই আমার মুন্নির কথা মনে পড়ে। সরোজিনী বিদ্যামন্দিরের ছাত্রী, পনেরোর এই কিশোরী আমার প্রেমিকা। তখন রঙমশাল ছিল আমার প্রিয় বাজি। আমার কল্পনার বুদবুদগুলো সহজে ফাটত না, রঙিন বেলুন হয়ে ঘুরে বেড়াত। আমি গেঞ্জি ছাড়া জামা পরতাম। অস্বীকার করতাম। অস্বীকার করতাম সব কিছু। স্যারের বাড়ি অকারণে বই আনতে যেতুম। মুন্নি অঙ্কের খাতা নিয়ে হাজির হত। দু'একটা অঙ্ক করেই একমনে আঙুলে বিনুনি পেঁচাত। বলত, অভিদা, বাবা বলছিলেন, তুমি নাকি ইলেক্ট্রনিক্স পড়বে। আচ্ছা ইলেক্ট্রনিক্সে নাকি খুব অঙ্ক কষতে হয়? তারপর নিজের মনেই বলত- তোমার তো অঙ্কে খুব মাথা, বাবা রোজই বলেন।

মনে মনে খুশি হই। বলি- এই আর কি। মুন্নি উঠে জানলার পর্দাটা সরিয়ে দেয়। বাইরে কনকচাঁপার মস্ত গাছ। বড়দির লাগান। ও একমনে চেয়ে থাকে।

-তুমি কী পড়বে। আমি জিজ্ঞাসা করি।

-আমি চাকরি করব। উদাস ভঙ্গিতে উত্তর দেয়।

-কেন? বলেছিলে না ইতিহাসে অনার্স পড়বে? তাছাড়া চাকরি এত সোজা নাকি?

মুন্নি ম্লান হাসে। জবাব দেয়, বাবাদের স্কুলের সেক্রেটারির অনেক হাত। বলেছে দুধের ডিপোয় চাকরি করে দেবে। বাবা আর চালাতে পারেন না। তাছাড়া সন্তান হিসেবে আমারও তো কিছু দায়িত্ব আছে।

এ মুহূর্তটা আমার কাছে সবচেয়ে করুণ। আমি সাহসী বীরের মত ওকে অভয় দিতে পারি না, অথচ বয়ঃসন্ধির উন্মত্ততা আমার মধ্যে সবসময়েই আমাকে নাড়িয়ে দেয়। প্রেমিকার দিকে তাকিয়ে মিথ্যে আশ্বাস দিই, এত ভেঙে পড়ছ কেন? আমি তো আছিই।

মুন্নি মিষ্টি হাসে। এ হাসি নিষ্ফল প্রতিশ্রুতির প্রতিক্রিয়া, না আমার ভালবাসার স্বীকৃতি তা ঈশ্বরই জানেন। ও যেন আমায় পুত্রস্নেহে সান্ত্বনা দেয়- অভিদা জানো, আমার ছেলেবেলা থেকে না চাকরির ইচ্ছা, বড় পিসির মতো। পিসি কত টাকা মাইনে পায়। বিনে পয়সায় টিফিন।

অন্ধকারে তপেনদার বিড়ির আগুন লাল সিগনালের মতো দপ দপ করে। উনি শেষ টান দেন। ছোট ছোট ধোঁয়ার মালা আমাদের নাক বরাবর ঘোরাঘুরি করে। উনি ভোটের ফলাফল ঘোষণা করেন।

বিপ্লবী বন্ধুদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী করুণাবাবুকে খতম করা হোক। অভিষেক যোগ্য সংগঠক। নিষ্ঠাবান কর্মী। এই তার প্রথম অপরাধ। বয়স তার নিষ্ঠার কথা মনে রেখে ওকে ক্ষমা করা হল। বিপ্লবী বন্ধুদের ইচ্ছা, অভিষেক এ কাজের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিক।

ওয়াগান থেকে মাল খালাসের আওয়াজ পাই। তলার মাটিতে কাঁপন দেয়। ক'দিন ধরে মায়ের কথা মনে পড়ে। ভাবি একবার দেখা করে আসি। দেখা আর হয় না। আমার অদ্ভুত অদ্ভুত সময়ে মায়ের কথা বড় মনে পড়ে। শ্মশানে যখন শবদাহ দেখি, পোড়া মাংস ধুনো আর কর্পূর সেন্টের গন্ধ, কেন জানি না মায়ের কথা মনে পড়ে। এ অনুভূতি আমার অনেকবার হয়েছে। স্টেশনে কাউকে তুলে দিতে এসে বা হাসপাতালে ও.টির পাশ দিয়ে যেতে যেতে। ঘষা কাচের ওদিক থেকে ওষুধের গন্ধ আর আবছা আলো, জীবন কিংবা মৃত্যুর খবর বয়ে আনে, আমি মাকে দেখি।

এখন বাড়ি যাওয়া বারণ। পুলিশের কড়া নজর বাড়ির উপর। রাতে প্রতিরোধ বাহিনী পাড়া পাহারা দেয়। দু'দিন আগে ওরা তিনজন বিপ্লবীকে ঠেঙিয়ে মেরেছে। রক্তের বদলে রক্ত। গ্লাডিয়েটারদের লড়াই চলেছে। খুঁচিয়ে মারার প্রতিযোগিতা। সব দেহাংশ আমার মুখস্ত। পরেশের মাথায় পাথরের আঘাত। তপনের তলপেটে গুলি। অমিতাভের অণ্ডকোষ ছিন্ন। মানুষের মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ আওয়াজ- অবশ্য এখনও সে বেঁচে আছে। বেশ বুঝতে পারি যন্ত্রণা আর ঘৃণার চেকভালব খুলে দিয়েছিলাম। কিন্তু তবু মানুষের সঙ্গে দূরত্ব? এ বিদ্বেষ? ঘৃণা? এখন দেওয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে। যৌবনের উচ্ছলতায় অকালে ভাটা নামে।

তপেনদা একমাথা রুক্ষ চুলে সরু সরু আঙুল চালিয়ে চুলগুলো ঠিক করেন। দু'হাতে পাঞ্জাবির আস্তিন গুটিয়ে আজকের জমায়েতে এই প্রথম আমার দিকে তাকান।

-অভিষেক! প্রয়োজনীয় সাহায্য তুমি ফুটের কাছে পাবে। ও একশনের অভিজ্ঞ কর্মী। কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ও তোমার পাশে থাকবে। তোমাদের মিশন সফল হোক।

একপাল কুকুরের চিৎকার শুনি। যেন নরকে তেলের কড়াই-এ ক'টা হতভাগার শেষ আর্তনাদ। মুখে লালা কাটে। টক টক স্বাদ পাই- বোমির।

মিশ্রজীর বউ ছুটতে ছুটতে এসে খবর দেয়, বাবু পুলিশ। জলদি ভাগ জাইয়ে। অন্ধকারে মিশে যাই। সবাই।

দুই
বহুদিন বাদে মাকে চিঠি লিখি। মুন্নির নামে পোষ্ট করি। বাড়ির ঠিকানা দিলে পুলিশের হাতে পড়ার সম্ভাবনা।

মাগো, তোমায় দেখিনি, কতকাল। আজকাল তোমার কথা প্রাই মনে হয়। তখনই ভাবি তোমার ইচ্ছা আর পূরণ হল না। আমায় ক্ষমা করো। ছোটনকে তুমি ইলেক্ট্রনিক্স পড়িও। আমার সব বই সিঁড়ির ঘরে বস্তায় বাঁধা আছে। যত্ন করে রেখে দিও। আর তো ক'টি বছর, দেখতে দেখতে কেটে যাবে। ওর দিকে একটু নজর রাখবে। বাইরে যেন বেশি মন না দেয়। ভীষণ চঞ্চল-ঠিক আমার মতো। চিন্তা করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। ও নির্ভয়ে পড়বে। আশীর্বাদ করো মা- আমি যেন তোমার কাছে ফিরে আসি। বারবার বড় দেখতে ইচ্ছে করে।

চিঠিটা লিখে নিজেকে ভীষণ হাল্কা লাগে। জেটিতে পা ঝুলিয়ে বসে থাকি। খড় বোঝাই নৌকাগুলি যেন ডুবুডুবু করেও ডোবে না। দু-একটা ঢিল ছুঁড়ে মারি ওদের নিজের খেয়ালে।

ফুটে আমাকে ক'দিন ধরে আমাকে তালিম দেয়। হত্যার তালিম। সংহরণ তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, ঘাতকের মনস্তত্ত্ব। দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ভৌগলিক অবস্থান। মগজ, মুখবিবর, রসনা, গলনালি, পাকাশয়, মলাশয়, শ্রেণী, উপস্থ ইত্যাদির নিখুঁত বর্ণনা। পেশাদারী ভঙ্গিতে অস্ত্র শিক্ষা দেয়।

-শিকারের দিকে তাকাবি না, দুরত্ব রাখবি দু থেকে পাঁচ ফুট। এর বেশি হলে ফসকে যেতে পারে।

-কেন? বেকার প্রশ্ন করি।

-কারণ পাইপ গানের নিশানার কোনও ইন্ডিকেটর নেই। ও তৃপ্ত অধ্যাপকের ভঙ্গিতে উত্তর দেয়, এর সবটাই তৈরি করেছি নিজেদের কারখানায়। কারিগররা আরো উন্নত করার চেষ্টা করছে। হয়ত একদিন হবে, সেদিন তুমি আমি থাকব না। সুফল ভোগ করবে তোমার-আমার ভবিশ্যৎ প্রজন্ম। গা গুলিয়ে ওঠে। সুফল ভোগ করবে ভবিশ্যৎ প্রজন্ম! হয়ত তাই।

ক মিলিমিটার ছেঁদার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে ক্ষমতার উৎস। সীতে রঙের বর্তুলাকার যন্ত্রটি আমাদের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় হাতিয়ার। ও সন্তান স্নেহে পাইপের গায়ে হাত বুলায়।জ্যান্ত চোখে মমতার ঝিলিক দেখি। ওকে মাঝে মাঝে সিদ্ধপুরুষ মনে হয়। যেন উপনিষদের সেই বস্তুর সন্ধান পেয়েছে, যা পেলে সব পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে ও পারফেকশানিস্ট। কোনও আপস-মীমাংসায় রাজি নয়। কোনদিন হাসতে দেখি না, কাঁদতে দেখতে না। প্লাস্টার অফ প্যারিসের মুখ। নির্লিপ্ত অভিব্যক্ত। শুধু জ্যাত চোখটা সময় বিশেষে নেচে ওঠে। মৃগয়ার সময়।

-ওই কুকুরটা দেখ। ফুটে বলে।

হাত দশ দূরে রেল লাইনের স্লিপারে ঠেস দিয়ে নিরীহ জীবটা ঘুমোচ্ছে। ঝিমধরা দুপুরে নিশ্চিন্ত আরামে। বোধহয় গর্ভবতী। পরিপুষ্ট বুকে পর পর ক'টা স্তনবৃন্ত। স্ফীত, বুলেটের নাকের মতো ছুঁচলো।

-ধর ওইটা তোর লক্ষ্য। কোথায় আঘাত করবি? মাথা, বুক না পেট?

সংশয় বেড়েই চলে। যে কোনও জায়গায় আঘাত করলেই ও মরবে। তবু অজ্ঞতার ভান করি। বলি- মাথা?

ফুটের জ্যান্ত চোখ নেচে ওঠে। বলে-মাথা আমার প্রিয় জায়গা। লাগাতে পারলেই শিকার কাত। তবে অসুবিধেও আছে।

-কি করবে?

ফসকে গেলে ও সাবধান হয়ে যাবে। চিৎকার করবে।

-তবে?

-স্যারকে তুই বুকেই টার্গেট কর। নতুন শিকারীর পক্ষে বুকিই ভাল। যদি না মরে আমি পাশ থেকে ভোজালি চালাব গলায়।

আমাদের কথাবার্তায় কুকুরটার ঘুম ভেঙে যায়। চোখ পিটপিট করে। বোধহয় ষড়যন্ত্রের গন্ধ পায়। হেলে দুলে লেজ নাড়তে নাড়তে গঙ্গার দিকে হাঁটা দেয়।

ওর অপসৃয়মাণ শরীরের দিকে তাকিয়ে ফুটা বলে, শিকার যেন বুঝতে না পারে। বুঝলেই কাজ শক্ত হয়ে যাবে। তখন ও শেষ কামড় দেবে।

শনিবার আঘাতের দিন। দিন তিনেক বাকি। স্যারের বাড়ি মনসাতলায়। ঘন্টাখানেকের রাস্তা। স্কুলে এখন গরমের ছুটি। রাস্তায় ওঁকে পাওয়া যাবে না। ফুটে চিন্তিত গলায় বলে, বাড়িতেই কাজ কর। ঝামেলা নেই। শ্বশুরবাড়ির আদর পাবি।

তিন
শনিবার। দীর্ঘ পাঁচ বছর বাদে স্যারের বাড়ির সামনে কনকচাঁপার গাছটা বড় অচেনা মনে হয়। কত নতুন ডাল আর অঙ্গবিন্যাস নিয়ে ওটা আজ দাঁড়িয়ে। বাড়িটা যেন দূর গঞ্জের পরিত্যক্ত মন্দির। গায়ের ছাল ফেটে লাল সুরকির দগদগে ঘা। নারকেল দড়িতে জানলার পাল্লা বাঁধা। এক চিলতে বাগান। রাঙচিতের বেড়া দিয়ে ঘেরা। সামনে তুলসী মঞ্চ। পত্র-বিহীন কঙ্কালসার বৃক্ষদেবতা। রাশি রাশি মঞ্জুরি। জীবিত কিংবা মৃত। নিভু নিভু সন্ধা প্রদীপ। আমার কৈশোরের তীর্থমন্দির। শেষ প্রেম। স্থবির হয়ে যাই। দূরে ফুটেকে রাস্তায় লুকিয়ে থাকতে বলি, স্মরণ করিয়ে দিই, গুলির শব্দ যেন চলে আসে।

দূরে সাঁতরাগাছির ঝিল থেকে ভেসে আসে ঝাঁক ঝাঁক বুনো হাঁসের ডাক। অস্পষ্ট কিন্তু তিক্ষ্ণ। সন্ধার সেই সকরুণ হংস বিলপন ধীরে ধীরে আমায় সম্মোহিত করে। নেশাড়ুর মতো সদর দরজায় পা দিই। পাল্লায় চাপা আর্তনাদ। বাড়িতে মানুষের চিহ্ন নেই। প্রায় অন্ধকার ঘরে তক্তপোশ পাতা। একদিকে বইয়ের রেক-ঠাসা বই। পা টিপে টিপে এগুই। পাকা নিশিকুটুম্বের মত। শক্ত কিছুতে আঘাত লাগে। ঝিন ঝিন করে ওঠে পায়ের বুড়ো আঙুল। স্যারের হামানদিস্তা। পান ছিঁচে খান। সেই কোন কালে ওঁর দাঁতগুলো চলে গেছে গোরা সাহেবের ঘুঁসিতে। ঘরের মধ্যে ভ্যাপসানি গন্ধ- দেওয়াল থেকে ঝরে চুন বালির। আশ্চর্য। এরা কি সব উঠে গেল!

ভেতর দালান ফাঁকা। কোণে ক'টা বাক্সপ্যাঁটরা থরে থরে সাজানো। এক দেওয়ালে নাইলনের দড়ি। মেয়েদের সাজ পোষাক ঝুলছে। শাড়ি, ব্লাউজ, ছেঁড়া অন্তর্বাস। দেওয়ালে আঁটা কোনাকুনি ভাঙা একটা আয়না। তাতে একরাশ রঙিন টিপ। নৈঃশব্দের গাঢ়তা চারদিক থেকে আমায় কুরে কুরে খায়। ঘুণপোকার মত। হঠাৎ সদর দরজা খোলার আওয়াজ পাই। নিজের অজান্তে পাইপগানে হাত চলে যায়।

মুন্নি ঘরে ঢোকে। প্রায় অন্ধকারে এক অশরীরী জীবকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিকট চিৎকার করে- কে? শব্দের ঢেউ চার দেওয়ালে ধাক্কা খায়। একযোগে আক্রমণ করে আমায়। আমি লাফিয়ে সামনে চলে আসি। ওর মুখ চেপে ধরি, বলি আমি অভি।

ও ফোঁস ফোঁস করে হাঁপায়। হাতের চেটোয় মোটা ঠোঁটের ঝাঁক ঝাঁপানি। সেই নিষ্প্রভ সন্ধ্যার নীরবতায় আমি চুম্বন করি আমার বাল্যঅনুরাগিণীকে। ডালিমের ছোঁইয়ায় পেঁজা তুলোর কোমলতা। মুন্নি অনেকক্ষণ চোখ বুজে থাকে। এক সময় ঘুমন্ত গলায় বলে অভিদা, কতদিন পরে তুমি এলে।

ঝিমধরা মাথায় তখন ওর আঙুলের চুপি চুপি খেলা। বহু কষ্টে নিজেকে সামলে নেই। মুন্নির থেকে দূরে সরে আসি। জানালার বাইরে মিশকালো অন্ধকার। ও ঘরের আলো জ্বালে। হাঁটু ফ্রকের কিশোরী এখন পূর্ণ যুবতী। সারা শরীর ঝাঁ ঝাঁ করে। জিজ্ঞাসা করি, বাড়ির আর সব কই?

-আর সব? মুন্নির হাসি যেন বড় করুণ।

-দিদিরা? স্যার?

-বড়দি পল্টুদাকে বিয়ে করেছে।

অবাক হয়ে জিজ্ঞাস করি, পল্টুদা?

-হ্যাঁ পল্টুদা তুমি ঠিকই ধরেছ। শালিমারে ওয়াগান ভাঙে। প্রেম করে বিয়ে করল। না করেই বা করবে কি? বাবাতো বিয়ে দিতে পারতেন না।

-দেখা হয়?

-মাঝে মাঝে। লুকিয়ে। বাবা স্কুলে থাকলে দুপুরবেলা চলে আসে। এখন হাড়গিলে পাখি। পল্টুদা রাতে মদে চুর হয়ে আসে। আর দিদিকে ঠেঙায়। দিদি এখন এসে শুধু কাঁদে।

-আর মেজদি? রুদ্ধ স্বরে জিজ্ঞাসা করি।

-কলেজ থেকে একদিন বাড়ি ফিরল না।

-বাড়ি ফিরল না?

-হ্যাঁ, বাড়ি ফিরল না। কত খোঁজাখুঁজি হল। থানা, পুলিশ, কাগজ, রেডিও। সবই বৃথা গেল।

-তোমরা আর খোঁজ করলে না?

-খোঁজ করে কি লাভ। মুন্নি দার্শনিকের মতো উত্তর দেয়। অবাক হই। প্রশ্ন করি

-কেন?

-যে ইচ্ছা করে হারায় তাকে কি কেউ পায়? আমি দিদির ব্যাগে কতদিন দামী জিনিস পেয়েছি- সেন্ট, হেয়ার রিমুভার, আরও কত কি? সব তোমাকে বলা যায় না। জিজ্ঞাসা করলে মুচকি হাসত। আর বলত, এখন পচে লাভ কী? পচতেই যদি হয় তবে..., বলে থেমে যেত। তারপর খিল খিল করে হেসে বলত, দেখতেই পাবে।

মুন্নি আবার কাছে সরে আসে। মেয়েলী ঘন গন্ধ। কালো সার্টিনের মতো ঝাঁকঝাঁক চুল। পাইপ গানের রডটা বিশ্রীভাবে খোঁচা দেয়।

-সেজদি আর নদি সিংজীর ল্যাম্প কারখানায় কাজ নিয়েছে। চল্লিশ টাকা রোজ। মালিক খুব ভাল। টিফিনে পাঁউরুটি আর চা দেয়।

সেই ছোট কিশোরী আজ কত পরিণত। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। অবাক হয়ে চেয়ে থাকি।

-আমার কথা জিজ্ঞেস করলে না? ও হাত কোমরে রেখে টান টান হয়ে দাঁড়ায়। আমি জিজ্ঞাসু চোখে চাই।

-সকালে দুধের ডিপোয় কাজ করি। বিকেলে টিউশানি। এখন পড়িয়ে ফিরছি। ও তৃপ্ত ভঙ্গিতে উত্তর দেয়।

সময়ের কারসাজিতে কত ঘটনার অভিনয় ঘটে। গত পাঁচ বছর-মানে ক'টা এলোমেলো দৃশ্য। পরীক্ষাগার দাউ দাউ করে জ্বলে। অম্ল, ক্ষার, বহুবিধ রাসায়নিক দ্রব্য। উৎকট গন্ধ। নিস্তেজ গিনিপিগ। পণ্ডিতেরা চুপচাপ। মলোতটভ ককটেল। নাগিনীর নাচের মতো পুড়ে যায়- লক্ষ লক্ষ শব্দের ভাণ্ডার। নাভির তলায় শাড়ি। রোমশূন্য বগল। বিয়ারের ঢেকুর। বোকা মাস্টারের বোকা ফসল! আজ দিনান্তের বিষাদময়তা ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন করে এ ঘর, মুন্নি আমায়।

-তুমি বাবার ঘরে বোস। এক্ষুনি এসে যাবেন। এক কাপ চা করে আনি। ওর গলায় স্বাভাবিক সুর ফিরে আসে। তারপর কি ভেবে উচ্ছাসিত গলায় বলে, বাবা সেদিন তোমার খুব সুখ্যাতি করছিলেন। তুমি না থাকলে ওরা নাকি বাবাকে মেরেই ফেলত।

আমার সঙ্গে ওদের এই দূরত্বে নিজের অজান্তেই যেন মনটা খুশি খুশি হয়। স্যারের ঘরে দাঁড়িয়ে চার দিকে চোখ বুলাই। দুটো দরজা। একটা দালানের দিকে আর একটা রাস্তার দিকে। চেয়ারটা তক্তপোশ থেকে ফুট তিনেক দুরে রাখি। স্যার তক্তপোশে বসলে আমার সুবিধা। এত কম রেঞ্জে শিকার কিছুতেই ছাড় পাবে না। গুলির শব্দ শুনলেই ফুটে চলে আসবে। আমি পালাব। তারপর ফুটের ভোজালির কাজ। নিখুঁত পরিকল্পনা, শুধু শিকারের অপেক্ষায় বসে থাকা।

মুন্নির ডাকে সংবিত ফিরে আসে। ও কোমরে শাড়ির আঁচল জড়িয়ে দাঁড়িয়ে। হাতে চায়ের পেয়ালা।

মুখ থেকে অজান্তে বেরিয়ে আসে-পাকা গিন্নী। ও উত্তর দেয়- তবে কি দুধের মেয়ে?

-তাতো বটেই অন্তত চাকরিসূত্রে।

মুন্নি প্রাণ খুলে হাসে। বলে- জানো অভিদা? আজ না কতদিন বাদে এত জোরে হাসলাম। এ বাড়িতে এখন আর কেউ হাসে না, জোরে কথা বলে না। সবাই ফিস ফিস করে। কী ভাল যে লাগছে। তুমি মাঝে মাঝে এখানে এস অভিদা।

আমার পরিকল্পনা উল্টে পাল্টে যায়। স্যার এখনও এসে পৌঁছননি। এক অকারণ উল্লাস আমার গভীরে আরো শিকড় কেটে বসে।

সদর দরজায় আওয়াজ হয়। শিকারীর দৃষ্টিতে দরজার দিকে চাই। মেজদি আর ন'দি। দুই ক্লান্ত যুবতী। ভাষাহীন চোখ। পরনে ছাপা শাড়ি। আর গুটিকতক কাচের চুড়ি। রাঙাদি ফিস ফিস করে, অভি না?

রাঙাদিকে দেখে অবাক হই। পাঁচ বছরে কত বুড়িয়ে গেছে।

আমাদের একা ফেলে রাঙাদি হঠাৎ বলত- তোমরা গল্প কর অভি, ভাতটা দেখে আসি। তারপর দ্রুত বেগে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেত। আমি মুন্নির আঙুলে আঙুল জড়িয়ে খেলা করতাম। অনেকক্ষণ পরে মনে হত কিছু একটা বলা দরকার।

-মুন্নি, দেখো দেখো চাঁদটা দেখো। ঠিকযেন চাঁপাগাছটার ডালে নেমে এসেছি। মুন্নি উদাস সুরে বলত, পেড়ে দেবে?

ছাদের সিঁড়িতে পায়ের শব্দে মুন্নির থেকে দুরে সরে বসতাম। রাঙাদি এসে গম্ভীর গলায় বলত- রাত হয়েছে অভি, বাড়ি যাও। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে আনমনা হয়ে যেত। চাঁপার গন্ধভরা সেই জ্যোৎস্না রাতে রাঙাদিকে ভীষণ সুন্দরী মনে হত। চুরি করে দেখতাম। মুখে কপট গাম্ভীর্য। ঠোঁটে অভিমান। আধবোজা চোখ। নিজের মনে ধরা গলায় কি যেন সব বলত। ভাঙা গলা শুনতাম।

-আজ বাড়ি যাও অভি, পরে এস।

বোনেদের মধ্যে সবচেয়ে মৃদুভাষিনী ন'দি। ফর্সা, লাজুক। কিন্তু আজ যেন অতীতের ক'টা ছেঁড়া পাতা। গালে মেচেটা, সারা শরীরে কালো কালো দাগ। ব্লটিং পেপারে রক্ত-চোষা চেহারা।

দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলি। বুকের মধ্যে চাপ চাপ কষ্ট। দম বন্ধ করে জিজ্ঞাসা করি, ভাল আছ ন'দি?

ন'দি নিরবে মাথা নাড়ে। চোখে ভয় মেশানো জিজ্ঞাসা। ন'দির ভাষাহীন ভাষা আমার হৃদকম্পন দ্রুততর করে। মনে হয় চিৎকার করে বলি- আমিই সেই ঘাতক, সাবধান। সব ওলট পালট করে দিয়ে যাব। কিছু একটা করো। নয় মারো, না হয় মরো। হাতে তুলে নাও সৃষ্টির এই যন্ত্র। ওদের দুর্গে কামান দাগো। এ রকম দগ্ধে দগ্ধে মেরো না।

-অভি তুমি বসো। মুন্নির সাথে গল্প করো। আমরা আসছি। ন'দি আর রাঙাদি ভেতর ঘরে পা বাড়ায়। ও আপনমনে বাইরের ঘন অন্ধকারে কি যেন খোঁজে। আনমনা গলায় বলে- অভিদা, একটা সত্যি কথা বলবে? মুন্নির চোখে চাপা কৌতুহল। বলে

-তুমি এতদিন বাদে এলে কেন?

প্রশ্নটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু তৈরি ছিলাম না। অস্বস্তিতে পড়ে যাই। ইতস্তত মনে উত্তরও ভাঁজি।

আমার কোনও প্রতিক্রিয়ার আগেই ও বলে- আমি জানি।

-কি জান? আমি রুদ্ধ স্বরে প্রশ্ন করি।

-তুমি কেন এসেছ?

ওই স্বভাব-সরল মেয়েটা আমাকে অবাক করে। ওর মনের গভীরে জট পাকানো ভাবনাগুলোর গিট ছাড়াবার চেষ্টা করি। ভীত কন্ঠে বলি-কেন এসেছি?

-জানি, কিন্তু বলব না। বেশ তৃপ্ত মনে ও উত্তর দেয়।

আমি অভিষেক, মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। অর্ধশিক্ষিত বিপ্লবী যুবক। বর্তমানে প্রেমিক রূপধারী ভীরু সংহারক। গলে গলে যাই। বড়দির লাগানো চাঁপার ডালে ওঠা চাঁদকে মনে হয় পেড়ে আনি। মনের কোণে লুকিয়ে থাকা বাসনার তপ্ত নিঃশ্বাস শুনি। বড় দুর্বল হয়ে পড়ি।

আমি স্বভাবে ভীরু। অন্ধকারে ভয়, নিঃসঙ্গতায় ভয়, ভয় আমরা আশৈশব সাথী।

ছেলেবেলায় স্নানের ঘরে যেতে ভয় করত। মায়ের আঁচল ধরে যেতাম। স্কাই লাইটের ফাঁক দিয়ে একটা বিকট মুণ্ডু আমার দিকে তাকিয়ে থাকত। স্বপ্নে দেখতাম, জাঁতাকলে আটকে ছটফট করছি। প্রচণ্ড চেষ্টায় গলা ফেটে যেত। মা বুক থেকে হাত সরিয়ে ঠেলে তুলতেন- উঠে বস, বোবোয় পেয়েছে।

সেই বোবো এখন আমায় তাড়া করে। হঠাৎ হঠাৎ আক্রমন করে। একদম ঠাণ্ডা মেরে যাই।- কি ভাবছ? চুপ হয়ে গেলে? মুন্নি প্রশ্ন করে। শীতল গলায় বলি- তুমি জানলে কি করে আমি কেন এসেছি?

মুন্নি কথা নেয়। অভিদা, তুমি আবার পড়াশুনা করো না। ইলেকট্রনিক্স। লেখাপড়ায় কত ভাল ছিলে। আগুনের লকলকে শিখায় স্টুয়ার্ড হস্টেল জ্বলে ওঠে। এক ঝাঁক ননীর পুতুল। ধনাত্মক চশমা, রুক্ষ চুল, মাপা হাসি। পাসপোর্ট, এম এস-এম আই টি। গেঞ্জিব্লাউজ, গ্রিনল্যান্ড মেটারনিটি। স্কুল বাস, ধনাত্মক চশমা। উলঙ্গ কপিকুল ছটফট করে।

-কথা ঘুরিয়ো না মুন্নি জবাব দাও। আমি কেন এসেছি?

-বললাম তো বলব না। মুন্নি জানলার শিক ধরে মিটিমিটি হাসে। তারপর দরজার দিকে তাকিয়ে খুশির সুরে বলে ওঠে- বাবা। তোমার জন্য অভিদা কতকক্ষণ বসে।

স্যার আমাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। মুখের দিকে চেয়ে কিসের যেন খোঁজ করেন। ভ্যাপসা গরমে গায়ের জামা সপসপে ভেজা। নাকের ডগায় নেমে এসেছে চশমা। বগলে যথারীতি ছাতা। বিদ্যাসাগরী চুল তেলের অভাবে রুক্ষ।

-অভি জামাটা খুলে ফেলি? কি বল বাবা?

উত্তরের অপেক্ষা না করে উনি গেঞ্জি জামা দুটই খুলে ফেললেন। মৌজ করে তক্তপোশে বসতে বসতে বলেন- তুমি আরাম করে বসো বাবা। দ্বিধা করো না, গায়ের জামাটা খুলে ফেল, যা গরম।

আমি উত্তেজিত হয়ে বলি- না, না ঠিক আছে। নিজেরই অবাক লাগে। অজান্তে তলপেটে হাত চলে যায়।

স্যার আমার কন্ঠস্বরে অবাক হন। তারপর হঠাৎ মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলেন, অভি, আমি খুশি। খুব খুশি।

বিস্মিত গলায় বলি, কেন স্যার?

-কেন মানে?উনি উত্তেজিত হন। বুকের পাঁজরাগুলো হাঁপরের মত ওঠানামা করে।

-তুমি সাহসের পরিচয় দিয়েছ। ভীষণ সাহস। তুমি প্রফেসনাল কিলারের কাছ থেকে আমায় বাঁচিয়েছ। উনি দম ভরে নিঃশ্বাস নেন।

আমার মৌনতা সাক্ষি থাকে। উনি ব্যাথিত কন্ঠে বলেন- মরতে ভয় পাই না, জীবনে যাকে সত্য বলে ভাবি, তাকে কী করে অস্বীকার করি। কেন চুপ করব? কার ভয়ে?

মুন্নি রেগে যায়। বলে, তুমি এসেই অভিষাকদাকে জ্ঞান দিতে আরম্ভ করলে? এরকম করলে অভিদা আর আসবে না।

-জ্ঞান মানে? সত্য মানেই জ্ঞান? অভি, তুমি ভয় করো না। যাকে সত্য বলে যান তাকে আঁকড়ে ধর। জয় তোমার হবেই।

আমি শুকনো হাসি। মা, মুন্নি, মাস্টারমশাই, এরা চিরটা কাল আমায় দুর্বল করে দেয়। এদের ভাল করার ইচ্ছা অকটোপাসের মতো আমায় আক্রমণ করে। অকৃতকার্য হই। বার বার। যখনই এর উৎসমুখে যাই- মায়ের চোখে সকরুণ মিনতি দেখি। মুন্নির মুখে এলাচির গন্ধ পাই। স্যারের লেকচার শুনি। পরীক্ষার ফল আমার অজানা নয়। বুকের ভেতর গোঁ গোঁ শব্দ। বোবোয় পেয়েছে।

-স্যার একটা কথা বলার ছিল।

-কি কথা?

-একটু সাবধানে চলাফেরা করবেন। ওরা আপনাকে মারতে চায়। বহুদিন পর নিজের কন্ঠস্বর অচেনা লাগে।

-জানি অভি, আমি জানি। আমার জন্য চিন্তা করো না। তুমি বাড়ি যাও। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।

-কিন্তু স্যার ব্যাপারটা আপনি গুরুত্ব দিন। এত সহজ নয়। আমার মারার রিতিমত ট্রেনিং হচ্ছে।

-জগতে সব লক্ষ্যে পৌঁছনরই ট্রেনিং আছে। এটা আর নতুন কি? তুমি বিপ্লবী, লক্ষ্যে পৌঁছেছ। বলো, কত কষ্ট, কত বেদনার সিঁড়ি বেয়ে তুমি এখানে এসেছ।

তক্তপোশ থেকে নেমে শীর্ণ হাতে আমার কাঁধ চেপে ধরেন। গম্ভীর গলায় আমায় আদেশ দেন,- বাড়ি যাও অভি, রাত অনেক হল, মা চিন্তা করছেন।

বাঁদরের হাড়ের মতো পাইপগানটা তলপেটে খোঁচা দেয়। দরজার দিকে এগিয়ে যাই। মুন্নি আমার পাশে এসে ফিস ফিস করে- ওসব বাজে কথা, তাই না অভিদা? তুমি আমায় দেখতে এসেছিলে।

বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিকষ আলো চাদরে সারা আকাশ ঢাকা। চাঁদহীন আকাশ। ঝাঁপ বন্ধ দোকানপাট। ক'দিন ধরে চিরুনী তল্লাসী চলেছে। তারপর এনকাউন্টার ডেথ!

বড় ক্লান্ত। ঘুম পায়। মায়ের কথা মনে পড়ে।

ঘাড়ে পালকের ছোঁয়া লাগে। পাথরের চোখ। জ্যান্ত চোখের হলদে মণিতে ফড়িং-এর নাচ। দূরে মুন্নিদের কনকচাঁপার গাছটা স্পষ্ট দেখতে পাই। ডালে এক বিকট মুণ্ডু।

মাগো!

সমাপ্ত

মধুচক্র

লেখকঃ সুব্রত মন্ডল
এক
স্বাতী মিত্র জ্বালিয়ে যাচ্ছে। অপরাধ আমার দুর্বলতা। কোনও এক নরম সন্ধ্যায় হৃদয় উজাড় করে পিরিতির কাব্যকথা। তারপর খুনসুটি। এরপর যা হয়ে থাকে তা-ই হল।
স্বাতীর ফ্লাট থেকে নামার সময় দু-চারটে দৃষ্টিবাণ বেশ অনুভব করি। ওর অতিথিরা আশা হাউসিং-এ আদৃত নন। এটা নতুন কিছু নয়। এখন সব হাউসিং-এই একাকী মহিলা, ডিভোর্সী দু-চারজন থাকেন। যাঁদের প্রতিটি পদিক্ষেপই ক্যামেরায় ধরা। অদ্ভুত নব্য সভ্যতায় সমৃদ্ধ এই বহুতল কালচার। প্রমোটার, সরকারি চাকুরে, অধ্যাপক, কালোবাজারি, দুঁদে রাজনীতিকের সাম্যবাদি সহাবস্থান। অতীতকে ফেলে এসে নতুন জীবন। কিছু লাভ, কিছু লোকসান। সবাই একই সঙ্গে দৌড় আরম্ভ করেছে। অচেনা দৌড়বীরেরা অজানা জীবনপঞ্জির ওপর অহেতুক সম্ভ্রম আছে। সম্পর্কের শীতলতা কাটাতে প্রথম প্রজন্ম কেটে যায়। এরই মধ্যে কিছু একাকিনী আছেন, আলোচনা আর কৌতূহলের বিষয়বস্তু হয়ে।

বিনা ছাতায় ভিজতে হয়। একাকিনী মহিলা প্রতিপদে হোঁচট খান। জিজ্ঞাসু দৃষ্টি বা দৃষ্টিতারল্যে। মিসেস মিত্র এসব মানিয়ে নিয়েছেন। এখন ত্রিশ। সুর্য সবে মাঝ গগনে। পশ্চিমে হেলতে অনেক দেরি। বিবাহবিচ্ছেদের প্রথম পাঁচ বছর কেটেছে আত্ম-সন্মোহনে। উচিত-অনুচিত, অভাব-প্রাপ্তি, অনেক অনুভুতির ঐক্যতানে। ইতিহাস, বর্তমানের অর্থ, ভবিষ্যতের লক্ষ্য স্থির করার সময় যখন এল, জীবন অনেক সমস্যার জটিল পাটিগনিত। পার্থ প্রথম ক মাস খোরপোশ দিয়েছে, আদালতের নির্দেশ মতো। পরে অনিয়মিত। এখন একদম বন্ধ। বাবা সরকারি চাকুরে ছিলেন। স্নেহশীল পিতা। মেয়েকে তিনতলার ফ্ল্যাট দিয়ে গেছেন। ছেলেকে বঞ্চিত করে। মেয়ের বিয়ের চেষ্টাও করেছেন। কাগজের বিজ্ঞাপনে উত্তর এল, কয়েকজন বছর পঞ্চাশের প্রৌঢ়, আর একজনের বয়স বছর পঁচিশ। মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। লিভ টুগেদার চায়। মেয়ের মুখের হাসি আর দেখা হল না। স্বাতী এখন একা। অনেকজনের মধ্যে একা।

স্বাতীর ফ্ল্যাটের উল্টো দিকে আছেন মিসেস পলি গুহ। তিন-এর বি। স্বামী আয়কর বিভাগে উঁচু পদে কাজ করেন। এই চল্লিশেও মিসেসের গালের লালিমা দেখে সংসারের প্রাচুর্য বোঝা যায়। ওঁর সঙ্গে স্বাতীর সম্পর্ক অনেকটা ভালোবাসা আর ঘৃণার। ডিভোর্সের পর মিসেস গুহ অনেক সাহস জুগিয়েছেন। হালছাড়া ডিঙার বিপদ। পুরুষের প্রয়োজন। প্রতিবেশীদের কেচ্ছা কাহিনি। বিবেক গুহও আইনি পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু জীবন আইনের ধারা উপধারা নয়। কত অচেনা বন্দর বেয়ে একই জল বয়ে যায়। রং বদলায়, গতি বদলায়। এটা বুঝতে স্বাতীর মাত্র কয়েক মাস লেগেছে। তাকে আবার মামলা করতে হয়েছে। মাসোহারার জন্য। কদিন পরেই সে বুঝেছিল, ব্যাপারটা এত সহজ নয়। আইন শুভঙ্করীর চেয়েও জটিল। চাহিদার অনুভুতি নানা বাঁকের ধাক্কায় গতিহীন। ঘোলা জল। সময় এগিয়েছে। ঘৃণা নিস্তেজ। আদালতে সিলিং ফ্যান খটখট আওয়াজে ঘোরে। অথচ তার কোনও বিরক্তি নেই। পার্থকে দেখেও ঘৃনা নেই। অনুভুতি নেই। এই মানুষটাকেই দিনের পর দিন দেহ দিয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মে। কিন্তু এখন যেন ফ্রেমে আঁটা ছবি। তিনকাল একই সুরে বাঁধা তান। ডিভোর্স এত যন্ত্রনাময়। পদক্ষেপ এত যন্ত্রনাবিদ্ধ।

এখন পরিস্কার সে আর খোরপোশ পাবে না। পার্থ যতবার বন্ধ করবে, ততবার তাকে আদালতে ছুটতে হবে। যা সম্ভব নয়। অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু এত প্রয়োজন আগে বোঝেনি। কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে চাকরির আবেদনও করেছে। সাধারন স্নাতক। অভিজ্ঞতা নেই। পেশাদারি শিক্ষা নেই। কদিন বাদেই বুঝেছে ভদ্র চাকরি সম্ভব নয়। দেহদানের অঙ্গীকারের বদলে চাকরি। গদির বেওসায়ি, দোকানের মালিক, বোদ্ধা প্রকাশক, এ ব্যাপারে সবাই সাম্যবাদী। তুমি ডিভোর্সি, আমার অর্থ আছে। দরকার নম্র সহচরী। চুক্তি অলিখিত।

বিবেক গুহ স্ত্রীর চোখ বাঁচিয়ে যতটা সম্ভব ততটা সহানুভুতিশীল। অত্যন্ত ভদ্র পরিশীলিত মানুষের কাছে যতটা ভদ্রতা আশা করা যায়। অহেতুক কৌতুহল নয়, অথচ কিছু একটা করা দরকার। এই দুই-এর দন্দ্বে তিনি যে ভুগছেন, স্বাতী নারীসুলভ ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের বেতারে বুঝতে পারে। বুঝতে পারে প্রয়োজনে ওঁর সাহায্যও দরকার। আর তা বিনামুল্যে নয়। স্বাতীর যথেষ্ট আত্মসম্মান আছে, সে অহেতুক কৃতজ্ঞতাবোধের পীড়নে জীবনকে আর জটিল করতে চায় না। সেদিন বিনা নোটিসে বিবেকবাবু কলিং বেল বাজালেন। বিনা কারনে তৈরি করা অছিলায়। মিসেস দুপুরে কোথায় যেন বেরিয়েছেন। সময় কাটছে না। তাছাড়া মামলা সম্বন্ধে জরুরি কিছু আলোচনাও আছে। স্বাতীকে জানানো দরকার। একাকিনী মহিলা নিতান্তই অসহায়। যত দিন যাচ্ছে স্বাতীর হিতাকাঙ্ক্ষী বাড়ছে। হাউসিং-এর সেক্রেটারি, ডাক্তারবাবু, চারতলার মেধাবী ছাত্র স্বপন। বিবেকবাবু আর একটু কাছের মানুষ। দির্ঘদিন আইনি পরামর্শ দেবার সুবাদে কিছুটা হকও বোধহয় জন্মেছে। সোফায় বসতে বসতে অভিভাবকসুলভ ভঙ্গিতে বললেন, কী ঠিক করলেন মিসেস মিত্র?

মামলা করে কোনও লাভ নেই।

তার মানে তো রাস্কেলটাকে ছেড়ে দেওয়া।

ছেড়ে তো অনেকদিনই দিয়েছি।

কিন্তু আপনার কি হবে?

আমি ভাবতে পারছি না। যা হবার তা-ই হবে। আমি তো আটকাতে পারব না।

এরকম একটা লম্পটকে ছেড়ে দেওয়া নৈতিক অপরাধ। তাছাড়া তোমার সারাটা জীবন পড়ে আছে। একটু ভেবে দেখো।

তুমি সম্বোধনে স্বাতী অবাক হয়না। বাঘবন্দির খেলায় এরকমই হয়। প্রত্যাশিত। প্রথমে ভদ্রতা। পরে অন্তরঙ্গ অনুসঙ্গ। আরও পরে খাদ্য ও খাদক। তার একটা ছাতা দরকার। এখানে ছুতমার্গ গৌণ। প্রথম প্রয়োজন নিরাপত্তা পরে অর্থ।

স্বাতী প্রয়োজনের অতিরিক্ত আবেগে বলে, বিবেক আমায় ডিচ্‌ কোরো না। আমি বড় অসহায়। ঘন বৈশাখে চোখে জল আসে।

মিস্টার গুহর অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা যেন ধাক্কা খায়। বিবেকে সূক্ষ্ম দংশন অনুভব করেন। স্ত্রীর আসতে এখনও ঘন্টা তিনেক দেরি। এর মধ্যে কি হতে পারে। কল্পনার চরমে ভূমিকম্প, কাল-বৈশাখী। তিনি কিশোর প্রেমিকের মত স্বাতীর হাত ধরেন। স্বাতী কেঁপে ওঠে। যেন প্রথম প্রেমিকের স্পর্শনিবিড় ছোঁয়া। তিন মাস ইলেক্ট্রিকের বিল বাকি। সবুজ বিল এসেছে। রান্নার গ্যাস ফুরিয়েছে। কিনে খেতে হচ্ছে। সংসারে খুঁটিনাটি প্রয়োজন। ও এখন অসম্ভব শীতল। মস্তিস্কের সব বার্তাকে অনুভুতির দরজায় থামিয়ে দেয়। দৃষ্টি সহজ। বার্তাবহ। আরও কাছে আসে।

মিলনের পর মিঃগুহ সিগারেট ধরান। আর এক ঘন্টা চুরি করা সময় আছে। ফ্ল্যাটে গিয়ে চান করতে হবে। ভালোবাসাহীন মিলনের শেষে স্বাভাবিক নিয়মেই ঘৃনা আসে। গভীরে মহিলা মেয়েমানুষ হয়। এটা না হলেই বোধহয় ভালো ছিল। একই ছাদের তলায় মুখোমুখি ফ্ল্যাট। দিনে দুবার দেখা হয়। স্ত্রীর বান্ধবী। জনান্তিকে মেয়েছেলে। দাম্পত্য কলহে গৃহিণি মাঝে মাঝে এই কাব্যিক বিশেষণটি ব্যবহার করেন। সাময়িক হঠকারিতায় সুদুর ফল কি হতে পারে চোখ বুজে চিন্তা করেন। এই মুহুর্তে স্বাতীকে মেয়েছেলে মনে হয় না। বরং নারী শরীরের মৃদু গ্রন্থিসুবাস আবেশ অনুঘটকের কাজ করে। তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনের কিছু যুক্তি খাড়া করেন। স্বাতীর অর্থের প্রয়োজন। তিনি নেহাতই দাবার ঘোড়া। তাঁর আর্থিক সঙ্গতি আছে। এখনও অশ্বের পেশি আছে। কিছু অলিখিত কর্ত্যবোধও আছে।

মিষ্টার গুহ দাঁড়িয়ে পড়েন। স্বাতী চোখ বোজে শুয়ে। হালকা নিশ্বাস। কিছুটা নিশ্চিন্ত প্রশস্তি। হালকা হাসির ছোঁয়া। তিনি পকেট থেকে কয়েকটা একশো টাকার নোট বের করেন। খুব সবধানে গুঁজে দেন বালিশের তলায়।

দুই
আমার সঙ্গে স্বাতীর আলাপ নাটকের রিহের্সালে। অফিস ক্লাবের বাৎসরিক নাটকের মহড়ায়। বিবেকদা হাত ধরে আনলেন। ওঁর হাউসিং-এ থাকে। কলেজে নাটকের অভিজ্ঞতা আছে। এখন টুকটাক কল পেলে শো করে। আমার দেখেই পছন্দ হয়ে গেল। নায়িকার চরিত্রে বেশ মানিয়ে যাবে। মিটিং-এ তা-ই বললাম পরিচালক হিসাবে। কিন্তু স্বপ্নেও ভাবিনি স্বাতীর সাথে এভাবে জড়িয়ে পড়ব। এটা ছিল বিবেকদার অত্যন্ত উচ্চস্তরের চাল। আসলে তিনি মুক্তি চাইছিলেন। পরকিয়া বন্ধন থেকে। এটা বুঝতে অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। কিছু ন্যাকামি। কিছু কাব্যকথা। এই নিয়ে স্বাতী পর্ব। যখন পুরো ব্যাপারটা বুঝলাম, তখন অনেক সুতো ছেড়ে দিয়েছি। এখন হাউসিং-এর সবাই জানে আমি স্বাতীর বিশেষ বন্ধু। আড়ালে বাবু। অথচ আমি স্বাভাবিক জৈবিক নিয়মেই কাছে গেছি। পরে হৃদয় এগিয়ে আসে। দেহকে ছাপিয়ে অন্তরে গুনগুনানি। কার যে কখন কাকে ভালো লাগে।

আমি শৈবাল পাঠক। আর পাঁচজন বাঙালি ছেলের মতো স্নাতক। পরীক্ষা দিয়ে আয়কর বিভাগে চাকরি। অবসরে ছোটখাট মেরামতির কাজ করি। ইলেক্ট্রনিক্স জিনিসের। অনেকটা নেশা। বিবেকদার সূক্ষ্ম চালটা বুঝতে অনেকটা দেরি হয়ে গেল। যখন বুঝলাম স্বাতী হাফ-গেরস্ত তখন আমি দ্বিধা দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া মাকড়সার জালে মৌমাছি। ভালোবাসা বিপদ জানে না। দোষ দেখে না। স্বাতীর ভালোবাসার মৌচাকে আমিই প্রধান কর্মী। বাকিরা নেহাতই শ্রমিক। গনিকার বাঁধা বাবুর মতো। সূক্ষ্ম আত্মতৃপ্তিতে ভুগছিলাম। মামুলি খদ্দের নয়। বাবু। মাইনের অর্ধেক টাকা গলে যায়। দিন দিন চাপ বাড়ছে। বিবেকদার সঙ্গে মাঝে মাঝে মুখোমুখি হয়। মুচকি হাসির ব্যঞ্জনায় বুঝিয়ে দেন, কেমন দিলাম।

আমি অন্ধ। স্বাতীর কোনও বিশেষ বন্ধু ঘরে থাকলে, বারান্দায় বসে আমি তারা গুনি। এক একদিন ও পুরোপুরি আমার অধিকারে থাকে। মোবাইলের সুইচ অফ্‌। ঘর অন্ধকার। যেন সত্যিকারের প্রেমিকা। চুলে নীরবে বিলি কাটে। ঘুমন্ত গলায় বলে, শৈবাল, তুমি আমায় ভালোবাসো?

আমি জবাব দিই না। স্বাতী ভাঙা-ভাঙা সুরে বলে, খুউব? আমি সুখের সাগরে ভাসি। ক্লান্তিহীন এক বর্ষন সন্ধ্যায় জলে ভিজি। অনেক ভিজি।

স্বাতী আধো আধো গলায় বলে, শৈবাল আমাকে একপাতা টিপ কিনে দেবে, লাল টিপ।

আমার মনে হয় স্বাতী আমাকে ভালোবাসে। খুউব ভালোবাসে। এ মুহুর্তে চাইলে আমি হৃদপিন্ড উপড়ে দিতে পারি। বিবাহিত জীবনের চক্রব্যূহের বাইরে স্বাতী নামের মরীচিকা বা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কেরানি জীবনের প্রাপ্তির উল্লাস আমাকে নিয়ে যায় সেই বন্ধ্যা দ্বীপে, ঘুমন্ত এক আগ্নেয়গিরি। আবার শুনি, এই নির্জন সন্ধ্যায় এক টুকরো টিপ পরিয়ে দাও ওর কপালে। চুমু খাও ওর মেঘমালা চুলে।

স্বাতী বহুচারিনী, আমার কাছে সে অস্বীকার করে না। ওর দেহ বিকিকিনি অস্বীকার করে না। ওর বুভুক্ষা, সংসারের খুঁটিনাটি সবই আমার জানা। পুরুষের হৃদয়হীনতার কথা, অস্থির কামনার কথা আমার অজানা নয়।

কয়েক বছরের যৌন শ্রমে ও অনেক পাল্টে গেছে। মুখের কমনিয়তায় এসেছে এক অদ্ভুত রঙ্গিণী রূপ। দুটি ভুরু দুরকম কথা বলে। তবু সেই শুনশান সন্ধ্যায় স্বাতীকে মনে হয় কঠিন গাছের বুকে জড়িয়ে ধরা এক মালতি লতা। নির্ভরতা আর বিশ্বাস।

স্বাতী স্বপ্ন ছোঁয়ায় বলে, আমার ভার নেবে? শুধু তুমি আর আমি। আমরা চলে যাব অনেক দুরে।

তা কি করে হয়। আমার সরকারি চাকরি, সংসার।

কেন হয় না? আমার জমানো কিছু টাকা আছে। এই শরীরটা বেচে জমিয়েছি। তুমি একটা ব্যবসা করবে। কেউ আমাদের চিনবে না।

আমি চুপ করে থাকি। যে প্রশ্নের জবাব হয় না তার জবাব দিই কি করে?

স্বাতী খিলখিল করে ছেনাল হাসি হাসে, মুরোদ বোঝা গেছে। কাজের বেলা যত পিরিতি।

মাথা দপদপ করে। বিছানা থেকে উঠে পড়ি। শরীরে এখনও স্বাতীর গন্ধ। জামাটা গলিয়ে নিই। স্বাতী মুচকি হাসে। বলে তুমি আমার ভার নাও। আমি পাশে থাকব সারাটা জীবন।

একটা সূক্ষ্ম অপরাধবোধ কাজ করে, স্বাতীকে ব্যবহার করার জন্য। মিলনের উত্তাপ না ভালোবাসা না কি দুইই। নিস্তরঙ্গ জীবনে একটু ঝড়ের সন্ধান? নাকি ভাদ্র মাসে সারমেয়সুলভ রিরংসা। তবু মনে হয় স্বাতীর অদর্শনে সন্ধ্যামালতির গন্ধ পাই। বড় অসহায়। হৃদপিন্ডের খাঁচাটা বড় ছোট হয়ে আসে।

তিন
বিবেকদা আমাকে সাবধান করেন, কেটে পড়ো, ওমুখো হোয়ো না, তলিয়ে যাবে, ওনাসিসের জাহাজ ডুবেছিল, তুমি তো পাতি কেরানি। বিবেকদাকে আমার ভাঁড় মনে হয়। যাত্রা আসরের মোটা রসের ভাঁড়। রসেবশে জীবন ভরপুর। এখন পুরুত মশাইয়ের চরিত্রে নেমেছেন। অনেকদিন বৌদির সাথে মুখোমুখি দেখা হয়েছে। চোখে ক্রোধ আর ঘৃনা। অবচেতন মনে আনন্দও আছে। মুক্তির আনন্দ। ছেনালটা স্বামীকে বশ করতে পারেনি, পেরেছে তার অধস্তন মোরগকে। এই জেতার আনন্দ তাকে ঘৃনা করতে শিখিয়েছে। কয়েকদিন আগে বিবেকদার মুখে শুনলাম, উনি নাকি দল পাকাচ্ছেন। বলে বেড়াচ্ছে মধুচক্রের কথা। হাউসিং-এর নৈতিক অধঃপতন নিয়ে চিন্তিত। গৃহিণীরা কর্তাদের চোখে চোখে রাখছে, সেক্রেটারির স্ত্রী নাকি একজন প্রাইভেট আড়কাঠিকেও লাগিয়েছে। আবহাওয়া উত্তপ্ত। বিস্ফোরনের অপেক্ষায়।

বিবেকদার ফ্ল্যাটে অফিসিয়াল সভা ডাকা হয়েছে। সমর কৌশল ঠিক করার জন্য। কিন্তু সেক্রেটারি সমরবাবুর ভেটো নিক্ষেপে কিছু করা গেল না। উনি ব্যাপারটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেন। বলেন, ভদ্র মহিলা অসহায়। সামান্য প্রসাধনির ব্যবসা করেন। লোকজন আসে। গুহ গিন্নি রাগত স্বরে বলেন, প্রসাধনির ব্যবসা না দেহ ব্যবসা? উনি সমরবাবুর অহেতুক দুর্বলতার ব্যাপারটা জানেন।

আপনি তো প্রায়ই চা খেতে যান, কিছু দেখেননি?

সমরবাবু পোড় খাওয়া ঠিকাদার। জীবনকে অনেক কাছ থেকে দেখেছেন। ব্যবসার খাতিরে তাঁর রঙ্গিণীদের প্রয়োজন। স্বাতীকেও দু-একবার পাঠিয়েছেন। উচ্চ প্রশংসা মিলেছে। তিনি স্বাতীর কাছে কৃতজ্ঞ। সামনেই সড়ক নির্মাণের টেন্ডার বেরোচ্ছে। প্রায় পাঁচ কোটি টাকার কাজ। চিফ ইঞ্জিনিয়ার পুরোপুরি আমিষ পছন্দ করেন। আর কোন জাগতিক পদার্থে তার মোহ নেই। এতৎ অবস্থায় তিনি স্বাতীর মতো হরিণীকে কী করে এতগুলো হিংস্র হায়নার কাছে ছেড়ে দেন? তিনি বিবেকবাবুকেও দু-একবার চায়ের আসরে দেখেছেন। মুখোমুখি হয়েছেন। দুজনেই দুজনকে অর্থবোধক হাসিতে কুর্নিশ করেছেন। তারপর থেকে একটা অলিখিত নিয়ম রক্ষা করে চলেছেন। উভয়েই। তিনি সকালে বাজার থেকে ফেরার পথে এদিক ওদিক চেয়ে স্বাতীর ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়েন। আর বিবেকদা চা-এর পেয়ালায় চুমুক দেন সন্ধ্যার আলো আধাঁরিতে। এই বিনা পয়সার পিরিতি স্বাতীর অসহ্য লাগে। কিন্তু উপায় নেই। তাকে মানতেই হয়, আনুষাঙ্গিক ব্যবসার ঝামেলার মতো। স্বাতী অবশ্য কৃতজ্ঞ এ দুজন মানুষের কাছে। এদের অদৃশ্য বরাভয় না থাকলে স্বাতীকে কবে রং মেখে ধর্মতলায় দাঁড়াতে হত।

গুহ গিন্নির সতীপনায় সমরবাবু ব্যথিত হন। সঙ্গে আবার কর্তা সঙ্গত করছে। লোকটার এতটুকু বিবেকবোধ নেই। ঝড় যে আসছে তিনি বুঝতে পারছেন। তিনি দুরদর্শী। অহেতুক ফালতু ব্যাপারে যান না। তার মধ্যে দার্শনিক ব্যাপার স্যাপার নেই। কিন্তু উপকারীর মুল্য বোঝেন। কী করে ঝড় সামলাবেন মনে মনে আঁক কষেন। সেক্রেটারি হিসাবে তার কর্তব্যবোধও আছে। বেশির ভাগ মেম্বারই ছাপোষা। দু-চারজনের মাসিক বিল কয়েক মাস বাকি। এঁরা সাধারনত মিটিং-এ আসেন না। এঁদের নিয়ে ঝামেলা নেই। চিন্তা বিবেকবাবুকে নিয়ে। টাকার গরম আছে। মাছ কখনও ওজনে কেনেন না, কেনেন আকারে। তিনি এ ব্যাপারটা বাজারে লক্ষ করেছেন। তাঁর ব্যবসায়ী সত্তা বলে, এ রকম লোক পাল্টি খেতে দু সেকেন্ড সময় নেবে না। তিনি স্বাতীর আগত ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত হন। বলেন ম্যাডাম আমরা বরং থানায় জানাই। বিবেকদা একটা এফ আই আর করুন। উনি তো এসব ব্যাপারে এক্সপার্ট।

এক্সপার্ট কথাটার মধ্যে খোঁচা আছে। উচ্চারনের চড়াই উতরাই আছে। বিবেক গুহ দপ করে জ্বলে ওঠে। শালা হারামজাদা। শান্তির সংসারে দেশলাই মারছে।

চারতলার স্বপন রাজাবাজারে পদার্থবিজ্ঞানে গবেষনা করে। বিষয় মহাজাগতিক রশ্মি। স্বাতীর গুনগ্রাহীদের একজন। বাবার বয়স হয়েছে। সেই এসব মিটিং-এ আসে। বুড়োগুলোর ন্যাকামি দেখে তার পরিশীলিত চিত্ত বিচলিত হয়। তার সাম্যবাদী মন কিছুতেই মানতে চায় না এই বুর্জোয়াগুলোর চিড়বিড়ানি। সে আর চুপ করে থাকতে পারে না, বলে, আমরা বোধহয় একটু বাড়াবাড়ি করছি। একজন স্বাধীনচেতা মহিলার ব্যাক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছি।

গুহগিন্নি বিড়বিড় করেন হস্তক্ষেপ না পদক্ষেপ। তিনি রাগে ফোঁস ফোঁস করেন। হাউসিং-এ স্বাতীর যে এত হিতাকাঙ্ক্ষী আছে জানতেন না। সরষের ভেতর ভূত থাকলে তিনি এত অনাচার সামলাবেন কি করে।

তিনি গম্ভির গলায় বলেন, স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধও থাকা উচিত। স্বপন ছাড়বার পাত্র নয়। সে মহাব্রহ্মান্ড নিয়ে নাড়াচাড়া করে। সামান্য আশা হাউসিং-এর বায়ুস্তর নিয়ে তার কোনও চিন্তা নেই।

সে নিরীহ গলায় বলে, তবে তো আমাদের অনেকের স্বাধীনতা নিয়েই চিন্তা করতে হয়।

ক্রোধ মানুষের বুদ্ধি হরন করে। গুহ গিন্নিও আন্দাজ করতে পারেন না। তির কোন দিকে যাচ্ছে।

সমরবাবু দুঁদে ব্যবসায়ী। কিছুটা আন্দাজ করেন। মনে মনে স্বপনকে বাহবা দেন।

গুহ গিন্নি বোকার মতো বলে বসেন, কার স্বাধীনতার কথা বলছ? স্বপন আর এক সেকেন্ড সময় নষ্ট করে না, বলে, কেন আমার প্রতিবেশী ডাক্তারবাবু।

গুহগিন্নীর গালের লালিমা কয়েক ডিগ্রি বেড়ে যায়। ডাক্তারবাবুর সাথে পলির একটা সূক্ষ আশনাই আছে। বৃত্তান্তটি আরও সূক্ষতর বায়ুস্তরে যাতায়াত করে। তা আবার প্রথম ধরা পড়ে স্বপনের রেডারে। কর্মক্লান্ত ডাক্তারবাবু মাঝে মাঝে মদ্যপান করে রাতে বাড়ি ফেরেন। বেশ রাতে। সিকিউরিটি তখন গভীর তন্দ্রামগ্ন। এ নিয়ে বিবেকবাবুর কাছে নালিশো হয়েছে, তিনি মিটিয়ে দিয়েছেন। মাঝে মাঝে রাতে তালা খুলে দেবার মহৎ দায়িত্বটি গুহগিন্নিই নিয়েছেন।

স্বপন অনেক রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করে। সে জানে রাতের ঘন্টাধ্বনি মানেই ডাক্তারবাবু। একদিন ঘন্টার আওয়াজ শুনে একটু কড়কে দেওয়ার ইচ্ছা হল ডাক্তারবাবুকে। শিতের রাতে আলোয়ানে বুক মুখ ঢেকে সে সিঁড়ির এক কোনে। গুহ গিন্নি তখন সমাজ সেবায় ব্যাস্ত। তালা খুলে দিয়েছেন। ডাক্তারবাবু এক পা এক পা করে এগুচ্ছেন। গুহ গিন্নি নৃত্য শিক্ষিকার মতো ডাক্তারবাবুর তাল ঠিক করছেন। সে এক স্বর্গীয় দৃশ্য। স্বপনও কিঞ্চিত বেসামাল হয়ে পড়ে। গুহগিন্নির সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যায়। তারপর থেকেই গুহগিন্নি, ডাক্তারবাবু, দুজনেই স্বপনকে একটু বাড়তি খাতির করেন। জাগতিক ব্যাপারস্যাপার ছেড়ে, মহাজাগতিক বিষয়বস্তুর খোঁজ-খবর করেন।

স্বাতীর ব্যাপারটা স্বপন পুরোপুরি জানে। তার প্রচ্ছন্ন সহানুভুতিও আছে। বিবেকদাই তার অতীত জীবন নিয়ে সমস্ত ঘটনা বলেছেন। আর্থিক অনটন, বেঁচে থাকার চেষ্টা, তারপর শেষ চেষ্টা, এই মধুচক্র।

বিবেকবাবু গিন্নির এই গোপন প্রেম অভিসার জানেন না যে তা নয়। গভীর রাতে ঘন্টার মুর্ছনায় তিনি শ্রীকৃষ্ণর কপট নিদ্রার অভিনয় করেন। কারণ স্ত্রীর কাছে স্বাতী উপাখ্যান প্রকাশ হওয়ার পর থেকে এ লুকোচুরি প্রয়োজন আছে। উভয়েই দক্ষ অভিনেতা অভিনেত্রীর মতো পরস্পরের কাছে নৈতিক সমর্থন আদায় করেছেন। কিন্তু সবার সামনে স্বপনের এই অগ্নি আহুতি ভালো লাগে না। তিনি অপমানিত বোধ করেন। কে কত বড় সতী তাঁর জানা আছে। তাও যদি না তিনি স্বাতীকে স্বপনের সাথে দেখতেন। পার্কস্ট্রিটের পানশালায়। কিন্তু ব্যাপারটা জটিল হবার আশঙ্কায় তিনি প্রকাশ করতে পারেননি। এমনকি গিন্নির কাছেও।কারন তার সাথে সেদিন অফিসেরট ঠিকা কম্পিউটার অপারেটার অরুন্ধুতি ছিল। মহিলার রোজকার ঘন্টার হিসাব তাঁকেই দস্তখত করতে হয়। ব্যাপারটা চেপে যাওয়া ছাড়া গতি ছিল না। মিটিং যখন ভেস্তে যাওয়ার মুখে, স্বপন বলল, দেখুন, খুনিকেও হাকিমসাহেব আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেন। আমাদের উচিৎ, মিসেস মিত্রকে মিটিং-এ ডাকা। তাঁর বক্তব্য জানা। বিবেকবাবু, সমরবাবু হাঁ হাঁ করে ওঠেন। গিন্নিরাও ব্যাপারটার মধ্যে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পান।

স্বপন হেসে বলে, তা হলে ব্যাপারটা আমরা কিছুদিন অনুসন্ধান করি, মানে পর্যবেক্ষণ করি। আমি কাকিমাকে বলব, উনি খোলা চোখে ব্যাপারটা নিয়ে ভাবুন। কাকিমা মানে গুহগিন্নি।

কাকিমা শব্দটি গুহগিন্নি ঘৃনা করেন। তিনি লক্ষ করেছেন স্বপন এই শব্দটি ইদানিং ব্যবহার করছে। তাঁর গোপন অভিসার ধরা পড়ার পর থেকে। আগে স্বপন পলিদি বলত। মাঝে মাঝে বৌদি।

পলি প্রাচুর্যে ক্লান্ত। বড় একা। একমাত্র ছেলে দেওঘরে পড়ে। স্বামী না বলতেই শাড়ী, গয়না, প্রসাধনীতে ঘর ভরিয়ে দিয়েছে। এমনকী একটা মারুতিও। শরীরচর্চা, ভিটামিন যুক্ত খাবার, যথেষ্ঠ অবসর। পুরুষের দৃষ্টিতে এখনও তিরিশ। স্বাতী তার স্বামীকে বশ করেছে। তিনি পরাজয় মেনে নিতে পারেন না। ডাক্তারবাবু ও স্বপন দুজনেরই তাঁর উপর আকর্ষন আছে। দুজনকেই তিনি প্রশ্রয় দিয়েছেন। স্বামীর উদাসীনতা, স্বাতীর স্বেচ্ছাচারিতা তাঁকে উৎসাহ দিয়েছে। স্বপনের উপর তাঁর আকর্ষন অনেকটা বন্য, আর ডাক্তার তাঁকে মানষিক প্রশস্তি জোগায়। বিপত্নিক প্রেমিকের কাছে তিনি অনেকটা শোকেসে রাখা হিরের নেকলেস। অনেক যত্ন অনেক মূল্য। দুই বিপরিতমুখী স্রোতে তিনি ঘুর্ণিঝড়ে ঘোরেন।

তাঁর মনে হয়, আজকের আলোচনা সভা স্বাতীর জন্য নয়, কয়েকজন হৃদয়হীন পুরুষের দ্বিচারিতার কথা। ঘর, সংসার, স্ত্রী-পুত্র সহ কিছু শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পুরুষ। শয়ন, ভোজন, রমন, গৃহনির্মাণ সব অনিয়মের ব্যকরণ। তাঁর ঘৃনার তেজ় কমে আসে। একজন অসহায় নারীর প্রতি আর এক রিক্ত হৃদয়ের আর্তি।

দুপুরে পলির সময় কাটে না। স্বাতী তাকে অদৃশ্য চুম্বকে টানে। মনে পড়ে স্বাতীর ডিভোর্সের দিনগুলোর কথা, কত সান্তনা দিয়েছেন। স্বাতী তার হাতে হাত রেখে কত কেঁদেছে। স্বামীকে লুকিয়ে সামান্য অর্থ সাহায্য। সামান্য তরিতরকারি। স্বাতী এসব মনে রাখে। সিঁড়িতে দেখা হলে চোখ নামিয়ে নেয়। যেন পালিয়ে যেতে পারলে বাঁচে। পলি বুঝতে পারে, স্বাতী লজ্জিত। অপরাধী চোখ। পুরুষের কামনার কাছে নারী কত অসহায় সে জানে।

পলি সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে হাজির হয় স্বাতীর ফ্ল্যাটে। কলিং বেল টেপে। কাজের মেয়েটি দরজা খোলে। বোধহয় নতুন। পলিকে চেনে বলে মনে হয় না। দরজা খুলে বলে দিদি বাড়ি নেই। পলি বলে আমি সামনের ফ্ল্যাটে থাকি। দিদিকে ডাকো।

মেয়েটি কি ভেবে বলে, দিদি এখন কাজে। বন্ধু আছে।

আমি এখন বসছি। দিদির সঙ্গে কথা বলব। মেয়েটি কায়দাকানুন সব জানে, কিছুতেই ঢুকতে দেয় না। ঘরের ভেতর থেকে নারী কন্ঠে আওয়াজ আসে - কে রে?

আপনার নাম কী?

বলো পলিদি।

কিছুক্ষন পর পাশের ঘর থেকে স্বাতী বলে, বসতে দে। পলি ঘরে ঢোকে। সুন্দর সুচারু ভাবে সাজানো। দামি সোফা সেট। সেন্টার টেবিল। পাশে এরিকা পামের টব। এক কোনে মা কালীর ছবি। জবা ফুলের মালা দেওয়া। এখনও ঘরে দামি ধুপের গন্ধ। স্বাতীর বর্তমান স্বাচ্ছন্দ্য সে অনুভব করে।

তার অদ্ভুত অনুভুতি আসে। সোফার চামড়ায় হাত বুলোয়। মসৃণ। এখানেই কি তার স্বামী মিলিত হয়? সে এক কোনে সরে বসে। তার নিদ্রা আসে। স্বপ্ন অনুরণিত তরঙ্গে তাকে ভাসায়, কল্পনার সাগরে। পাশের ঘরে স্বাতীর কাজের চিত্র-কল্প ভেসে আসে। অনেক্ষন বসে থাকে। ঘরের দরজা খোলার আওয়াজে সংবিৎ ফিরে আসে।

একজন সৌম্যদর্শন উত্তর-চল্লিশ পুরুষ সামনের চেয়ারে বসে জুতোর ফিতে বাঁধেন দ্রুত বেগে। কোনও দিকে তাকান না। দরজা খুলে বেরিয়ে যান। মনে হয় কোথায় যেন দেখা। একটু যেন চেনা।

স্বাতীর দিকে এই প্রথম তাকায়। বহুদিন পরে চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আকর্ষণীয়া। মুখ, দেহ। লাস্যময়ী ছোঁয়া, পরনে হাউসকোট। একমাথা চুল কোমর পর্যন্ত। যে কোনও পুরুষের বিভ্রান্তির জন্য যথেষ্ট।

স্বাতী তাকে জড়িয়ে ধরে। কান্নায় ভেঙে পড়ে। পলি নিরবে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। স্বাতী ধরা গলায় বলে, পলিদি আমাকে ক্ষমা করো, আমার কোনও দোষ নেই। পলি নিরবে হাসে, বলে, আমি জানি, বিবেককে আমি খুব ভালো করে জানি, তোর ওপর আমার কোনও রাগ নেই।

পলি দুপুর হলে ছটফট করে। কী এক অচেনা আকর্ষণ তাকে এক পা এক পা করে নিয়ে যায় স্বাতীর ফ্ল্যাটে। সে স্বামীকেও বলেনি স্বাতীর সাথে বন্ধুত্বের পুনর্নবীকরণের কথা।

স্বাতী গল্প করছে। হাউসিং-এর পুরুষদের কথা। ছেলে বুড়ো সব। তার গুণগ্রাহী। স্বাতী প্রথমে চেষ্টা করেছে এদের স্পর্শ বাঁচিয়ে চলতে। সে বাড়ির দুর্নাম চায়নি কোনওদিন।

শৈবাল তাকে ভালবাসে অন্ধের মতো। সেও ভালবাসে। কিন্তু চায়না তার সংসার ভেঙে যাক। শৈবালের ভালবাসার টানা-পোড়েনে সে বিক্ষত।

এখানে পলির বেশ কয়েকজন নতুন বান্ধবী হয়েছে। কলেজ ছাত্রী, গৃহবধূ, শিক্ষিকা। চাঁচা ভুরু, দৃশ্যমান শরীর রোমশূন্য। পলি ভাবে এরা কি সবাই লেডি চ্যাটার্লি। স্বাতী ভুল ভেঙে দিয়েছে, না। কারও বাড়ি তৈরির কিস্তি বাকি। ব্যাংক গুন্ডা পাঠিয়েচছে। কারও সন্তান ইংরেজি মাধ্যমে পড়ে, স্বামীর সীমিত আয়ে চলে না। কারও স্বামী মদ্যপ, সব টাকা নেশায় ঢুকে যায়। ছাত্রীদের সমস্যা অন্য, পার্লারের খরচ, নতুন চুড়িদার, নাচঘরে প্রথম অভিযান। দু-একজন লেডি চ্যাটার্লি আছেন। যেমন মিসেস সরকার, উত্তর-চল্লিশ বলিষ্ঠা মহিলা। উনি খুশ থাকলে আর কলেজের ছাত্র পেলে বিনা পারিশ্রমিকেও কার্য করেন।

শীততাপনিয়ন্ত্রিত ঘরে পলি মাঝে মাঝে উত্তাল হয়ে ওঠে। অচেনা অজানা জগতের অনাহূত অতিথি হিসেবে শরীর কাঁপে। সারা দেহ ঘামে। এ কি শুধুই নিঃসঙ্গতা, স্বামীর উদাসীনতা। সে নিজেও উত্তর খুঁজে পায় না। একদিন মিসেস সরকার বলেন, পলি তুমি এখানে শুধু শুধু আসো কেন? সময় কাটে না? পলি উত্তর দেয় না। অবিরাম হাত কচলে যায়।

কী আগুন পোয়াতে আসো?

পলি অস্ফুট স্বরে কিছু বলে। দুঃখ, কম্পন, বেদনা মেশানো কিছু শব্দ।

তুমি এত সুন্দরী, হাউসিং-এ তোমার এত গুণগ্রাহী, তোমার কিসের দুঃখ?

পলি রেগে যায়। বলে, না স্বাতী আমার বন্ধু। দুপুরে বড় একা লাগে, তাই আসি।

আমাদেরও বন্ধু, অবশ্য কাজের।

পলির লালিমা গাঢ় থেকে গাঢ়তম হয়। যেন হাতেনাতে ধরা পড়ে যায়।

স্বাতী বাঁচিয়ে দেয়। মিসেস সরকারকে বলে, এরকম বোলো না, পলিদি খুব ভালো মানুষ। সে সময় আমাকে সাহায্য না করলে কোথায় ভেসে যেতে হত।

মিসেস সরকার বলেন, চলো পলি আমরা দুজন ভাসি। নৃত্যের তালে তালে। পলি ছুটে ঘর থেকে পালায়। নিজের ফ্ল্যাটে গিয়ে হাত মুখ ঠান্ডা জলে ধোয়, চোখ বুজে বিছানায় শুয়ে পড়ে। গহনে যে কী বার্তা আছে, তাকে নিয়ে যায় কয়েকজন মোহিনীর কাছে। বারবার।

সে প্রতিজ্ঞা করে আর কোনও দিন যাবে না স্বাতীর কাছে। দু-তিন দিন সত্যিই যায় না। কিন্তু চার দিনের দিন ড্রাগের নেশার মতো হাজির হয় ওর দরজার সামনে। যেন নিশিতে পেয়েছে। স্বাতী দরজা খুলে দেয়। হাত ধরে বসায় সোফায়। উদ্বিগ্ন গলায় বলে, পলিদি শরীর খারাপ? মুখ এত শুকনো কেন? পলি জবাব দেয় না। দু হাতে মুখ ঢেকে অঝোরে কাঁদে। স্বাতী কিছু বলতে চায়। ইতস্তত করে।

পলিদি একটা কথা বলব? যদি কিছু না মনে করো।

কী কথা?

আমি বলব কি না বুঝতে পারছি না। তুমি কীভাবে নেবে।

তুমি বলো, তুমি বলো। আমি কিছু মনে করব না।

এক ভদ্রলোক তোমার কথা বলছিলেন। আলাপ করতে চান।

পলি অবাক চোখে বলে কে ভদ্রলোক?

সেই প্রথম তুমি যেদিন এসেছিলে। ভদ্রলোক জুতোর ফিতে বাঁধছিলেন, উনি রোডস-এর বড় ইঞ্জিনিয়ার। আমাদের সেক্রেটারির বন্ধু, ভালো পেমেন্ট দেন।

পলি স্তব্ধ হয়ে যায়। তার যথেষ্ট প্রাচুর্য আছে। কীসের অভাব। দুজন গুণগ্রাহীও আছে। তবু বুকের খাঁচায় কেন এত তোলপাড়। হৃৎপিণ্ড আহত চিতার মত এক কোণে কামড়ায়। সে ঘৃণা করে পুরুষদের। তাদের বিশ্বাস ভঙ্গে সে মর্মাহত। স্বামী, ডাক্তার, স্বপন, তামাম দুনিয়ার পুরুষ পলির মোহিনী রূপে মুগ্ধ। নীলকন্ঠ। শুধুই কি শরীর, কোথায় ভালবাসা। কোথায় গেল সে শৈশবের পাখিরা, দোয়েল, শালিক, টিয়া। দুপুরে অহর্নিশি ফেরিওয়ালা হাঁক। ভালবাসা কি এদের সঙ্গেই পালিয়ে গেল। আমাদের কি কোনও হৃদয় থাকতে নেই। ভালবাসা থাকতে নেই। নিরালা দুপুরে বালিশ কি ভেজে না? তবু ওরা পণ্য ভাবে। মরা ভেটকি বা শীতে নতুন আলু, মূল্য যা-ই হোক না কেন।

সেই শুরু। প্রথমে স্বাতীর কাছে কলাবিদ্যায় শিক্ষানবিশি। তারপর হপ্তায় দু-চারদিন স্বাধীন পক্ষিণী। দুপুরে। খুব সাবধানে। প্রতিহিংসা, ঘৃণা, কামনা। সে নিজেওটঠিক উত্তর পায় না। হয়তো সব কিছুর নির্যাস। দুনিয়ার সব পুরুষই এক। শিক্ষিত, অশিক্ষিত, ধনী, দরিদ্র, সব এক। সারমেয়। চারপেয়ে ভাদুরে জন্তু। এখন আর বিবেক দংশন করে না। বরং পুরুষের সেবা তার ভালোই লাগে। ওদের মিথ্যার ফুলঝুরি শুনে হাসি পায়। চাটুকারিতায় মনে হয় মক্ষীরানি।

সেক্রেটারি স্বাতীকে সাবধান করে দেন। বিপদ আসতে পারে। উনি পলির ব্যাপারটাও জানেন। চিফ ইঞ্জিনিয়ার বলেছে। কোথাকার জল কোথায় গড়িয়েছে। কোনও কেলেঙ্কারি যেন না হয়। উনি সামলাতে পারবেন না। হাউসিং-এর অধিকাংশ মানুষই এককাট্টা অনাচার বন্ধ করো। ধরা পড়লে কিছু করার নেই। এতগুলো টি ভি চ্যানেল।

চার
দিন দিন ব্যাবসার শ্রীবৃদ্ধি হচ্ছে। আজ গোয়া কাল মুম্বাই। প্রায়ই বলে, ছেড়ে দেব। তারপর শুধু তুমি আর আমি। আমিও বসে আছি সেই কুয়াশাচ্ছন্ন তুমি আমি যুগের আশায়।

গুহগিন্নীর গোপন অভিসার আখ্যান আমার অজানা নয়। মনে হয় বিবেকদাও জানেন। কিন্তু কিছু করার নেই। দাঁতে দাঁত চেপে অপেক্ষা করতে হয়। এতে আমার হালকা মানসিক তৃপ্তি আছে। কিছুটা প্রতিহিংসাজনিত। রহস্যময় রূপকে বুঝিয়ে দিই, কেমন দিলাম।

সেদিন স্বাতী আসতে বলল। টিভি খারাপ। দেখতে হবে। এ ভুবনে আমার মতো খিদমতগার আর কে আছে। এ যেন মনিবিনির আদেশ। আমিও একপায়ে রাজি।

বেল টিপতে মিসেস সরকার দরজা খুলে দেন। সাত সকালেই মুখে ঘন প্রসাধনীর প্রলেপ। লিকারের মৃদু গন্ধ। স্বাতী বলেছে টিভিটা দেখতে। আমি বললাম, স্বাতী কোথায়? প্রশ্ন করে নিজেই অপ্রস্তুত হয়ে যাই। যেন একটু অপমানিত হই। জানা ব্যাপার। তবু নিজেকে পুরুষ বলতে লজ্জা লাগে। এ যেন পুতুল খেলা। মহারাণী আর প্রজা।

কী হল। আমাকে ভাল লাগে না বুঝি। মুখে একগাল মিচকে হাসি।

মিসেস সরকারের জীবনপঞ্জি আমার জানা। ছলাকলায় বাৎস্যায়ান গুলে খেয়েছেন। তবে মনটা ভাল। কাউকে ভাল লাগলে আর্থিক সাহায্যও করেন।

না, আর না। এই শেষ। ছাপোষা কেরানি। বেঁচে থাক আমার অফিস, ক্লাব, নাটক, লাইব্রেরি, টুকটাক মেরামতের কাজ। খারাপ কী। আমার জায়গায় আর একটা মোরগকে বসিয়ে যাব। অফিসের প্রদীপ। ফেশিয়াল করে। ঘাড়ে পাউডার মাখে। মুখে দাড়ি গোঁফ কম। থিয়েটারের নায়িকাকে মুফতে মোগলাই মাংস খাওয়ায়। অফিস ক্যান্টিনে।

পিকচার টিউব গেছে। হাজার পাঁচেকের ধাক্কা। অর্ধেক মাইনে। যদিও স্বাতীর ক্ষমতা আছে। তবু চটির পেরেকের মতো খিচখিচ করে। গত মাসেই ও একটা ঘড়ি দিয়েছে। এ মাসে আমার পালা। আমি তো স্বাতী নই। এখনও নৈতিকতা হারাইনি।

মিসেস সরকার সামনের সোফায় বসে। অবিরাম পায়ের দুলুনি দেখি। পায়ের গোছ থেকে শাড়ি দু ইঞ্চি ওপরে। এক জোড়া রূপোর নূপুর। ঝুমঝুম করে আমন্ত্রণের সুরে বাজছে। হ্যামলিনের বাঁশির সুরে বাজিয়ে যাচ্ছেন সুডৌল পদযুগল। বেশ টের পাচ্ছি উত্তেজনার পারদ। উনি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছেন ছাগশিশুর ছটফটানি। কামনার কাছে পুরুষের চিরন্তন পরাজয়। বিস্রস্ত বসনা নারীর মাদক আবেদনে আমি নিস্তব্ধ বিস্ফোরক। টুকরো পাথর ঘর্ষণের অপেক্ষায়।

হঠাৎ দরজায় দমাদ্দম ধাক্কা। মিসেস সরকার উঠে দাঁড়ান। রঙ্গিণী রূপ এক লহমায় পাল্টে যায়। যেন নেহাতই এক সাধারণ নারী। ভয়ার্ত চেহারা। অসহায় চাহনি। স্বাতী ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। এলোমেলো পোষাক। চিফ ইঞ্জিনিয়ার পোষাক সামলাতে ব্যস্ত। দুজন নারী ঠিক যেমন দৈনন্দিন অফিস, আদালত, দোকান বাজারে দেখি। হিংস্র শ্বাপদের সামনে দুটি অসহায় হরিণী।

সশব্দে দরজা ভেঙে পড়ে। চার-পাঁচজন পুলিশ। পেছনে ক্যামেরা হাতে টিভি ক্রু। বিবেকদা, ডাক্তারবাবু, স্বপন আরও অনেক।

মহিলা সাংবাদিক ধারাভাষ্য দিয়ে চলেছেন। ঝড়ের গতিতে। দরজা, জানলা, মদের গেলাস, আকাশের রং।

কসবায় আবার মধুচক্রের আসর। দু-জন মহিলা সহ দুজন পুরুষ ধরা পড়লেন। পুলিশের কাছে কিছুদিন ধরে অভিযোগ আসছিল। সেই অনুযায়ী নজর রাখা হয়েছিল। আজ হাতে নাতে ধরা হল। ফ্ল্যাটের মালিক স্বাতী মিত্র। মহিলা ডিভর্সী ও প্রসাধনী ব্যবসার আড়ালে মধুচক্র চালাতেন। আসুন দেখা যাক এখানকার বাসিন্দারা কী বলেন।

আপনার নাম?

আমি পলি গুহ, উল্টো দিকে থাকি।

আপনি কি জানতেন, এখানে দেহ ব্যবসা চলছে?

হ্যাঁ আন্দাজ করতাম। এই মেয়েটা পরিবেশ বিষিয়ে তুলেছিল।

আপনারা প্রতিবাদ করেননি?

আমার স্বামী বহুবার প্রতিবাদ করেছেন।

আপনি কী করেন? সাংবাদিক মাইক ডাক্তারবাবুর সামনে ধরেন।

আমি ডাক্তার।

আপনি খবর রাখতেন?

রাখতাম মানে খবর ছিল, কিন্তু মহিলা যে তলে তলে মধুচক্র চালাচ্ছেন স্বপ্নেও ভাবিনি। আমি জানতাম মহিলা প্রসাধনীর ব্যবসা করেন। এখানকার মহিলাদের সেলস গার্ল ভাবতাম।

স্বপনের মনে হল, কিছু বলা উচিত। সে ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসে। বলে, মহিলা ভেষজ ক্রিমের ব্যবসা করেন। মাঝে মাঝে পার্টি দেন। ব্যবসার স্বার্থে। আমিও দু-চারবার পার্টিতে এসেছি। মদ্যপানও করেছে। এ বাড়ির দু-চারজনেও যোগ দিয়েছে।

গুহ সাহেবের রক্তচাপ তখন হিমাঙ্কের দিকে। তিনি স্বপনকে ভয় করেন। পাছে বেফাঁস কিছু বলে দেয়। তিনি স্বপনকে ঠেলে মাইকের সামনে আসেন। বলেন, দেখুন আমরা সবাই ছাপোষা মানুষ। যে যার কাজ করি। সময় কোথা দিয়ে চলে যায় খোঁজ রাখি না। যা বলার আমাদের সেক্রেটারি সমরবাবু বলবেন। উনি মাইকটা ঠেলে সমরবাবুর দিকে ধরিয়ে দেন।

দেখুন, এ বাড়িতে একগাদা স্কুল কলেজের ছেলেমেয়ে। তারাই বা কী শিখবে। আমরাই বা নৈতিকতার কী শিক্ষা দেব।

আমি শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। রোজগার চেনা মুখগুলো মনে হয়, সারি সারি নরমুণ্ড, ঘৃণার ছেঁড়া পাতা।

সাংবাদিক মাইকটা হঠাৎ আমার সামনে ধরেন।

আপনি কী করেন?

আমি টিভি মেকানিক। আমতা আমতা করি।

মানে, আপনি টিভি সারাতে এসেছিলেন? বলে স্বাতীর দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে চায়। স্বাতী নীরবে ঘাড় নাড়ে। ভিড়ের মধ্যে থেকে বিবেকদা বলে ওঠেন।

হ্যাঁ হ্যাঁ আমি চিনি। আমার বাড়ির টিভির কাজও উনি করেন।

স্বপন বলে, আমার বাড়ির কাজও করেন। অফিসার আমার দিকে আড় চোখে তাকান। বুক ভরে দম নিই। মুক্তি এত সুন্দর জানতাম না। ভালোবাসা এত বেদনার জানতাম না। যন্ত্রণার শেষ সীমায় এসে সব যন্ত্রণা ক্ষমতা হারায়। সেই সীমাহীন সাগরের উত্তাল ঢেউ-এর মাঝে স্বাতী নামের ডিঙাটিকে আমি আঁকড়ে ধরলাম। স্বাতী হাত ধরে তুলে নিল। ছোট্ট ভঙ্গিতে আমার সব প্রশ্নের উত্তর দিয় গেল।

বিবেকদা মুচকি হাসিতে জানালেন কেমন দিলাম?

সমাপ্ত