লেখকঃ মিহির চক্রবর্তী
লজিকের দুটি অংশ, একটি ভাষা নিয়ে আর একটি অর্থ নিয়ে। ভাষাগত অংশের আবার দুটি উপঅংশ - বর্ণমালা, শব্দ ও বাক্যগঠনের একটি ভাগ এবং সিধান্ত নির্মাণ-প্রক্রিয়ার অন্যটি। শুধু গাঠনিক (structural) দিক দিয়ে দেখলে সিধান্ত নির্মাণ বলতে বোঝায় কতগুলি প্রাথমিক বাক্য থেকে কোনো সিমাবদ্ধ যান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অন্য একটি বাক্যে পৌছানো - যাকে বলা হয় সিদ্ধান্ত-বাক্য। এই প্রক্রিয়া একটি খেলার মত, কিছু নিয়ম মেনে নিয়ে সঞ্চলন, যে চলার কোনো অর্থ খোঁজা হয় না। সু-সিদ্ধান্ত অথবা কু-সিদ্ধান্ত হচ্ছে কিনা এই মানসূচক আলোচনা হতে পারে কোনোরকম দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহন করলে তবেই। লজিকের অর্থগত অংশ থেকে এই দৃষ্টিভঙ্গী আসে, অথবা দৃষ্টিভঙ্গী থেকেই অর্থ তৈরি হয়। ক্লাসিকাল লজিক মনে করে সেই সিদ্ধান্তনির্মাণ-প্রক্রিয়াই আমরা গ্রাহ্য করব, যার ফলে সত্য প্রাথমিক বাক্যসমুহ থেকে সিদ্ধান্ত-বাক্যই শুধু উপনীত হওয়া যায়। অবশ্য 'সত্য' কাকে বলে অথবা তা সহজলভ্য বা আদৌ লভ্য কিনা তা নিয়ে বিতর্ক চলে; এ বিতর্ক কোনোদিন শেষ হবে বলে মনেও হয় না।
একটি কথা এই ক্ষনেই বলে রাখা ভালো। ক্লাসিকাল লজিকের নির্মাণ-প্রক্রিয়া এমনই যে কোন সুসংগত (consistent) প্রাথমিক-বাক্য থেকে পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত-বাক্যে পৌঁছানো যায় না। এই লজিক এবং তার উপর ভিত্তি করে তৈরি ক্লাসিকাল গণিত স্ববিরোধী সিদ্ধান্তকরনকে অর্থহীন অপক্রিয়া বলে মনে করে, বস্তুত এই পরিস্থিতিকে তারা ভয়ই করে এবং সাধ্যমত এড়িয়ে যায়। 'স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত গঠন' এবং 'যে কোনো সিদ্ধান্তই চলতে পারে' এই দুই পরিস্থিতিকে পুরোনো লজিক সমগোত্রের মনে করে থাকে। অনেক লজিকই তা করে না। স্ববিরোধীতাকে স্বাভাবিক করে তোলা ননসেন্স রচনাশৈলীর অন্যতম রীতি।
সুকুমার রায়ের আলোচনা প্রসঙ্গে আমি মূলত তাঁর 'ননসেন্স' রচনাগুলিএ অন্তর্নিহিত 'লজিক' খোঁজারই চেষ্টা করব। সময়ের প্রেক্ষিত অথবা ন্যায়-অন্যায়, শুভ-অশুভ বিচার ইত্যাদি আমাদের পরিধির বাইরে থাকবে।
এ জাতীয় লেখাগুলির ভাষাগঠনের উপাদান প্রধানত তিনটি, প্রথমত বাংলা ভাষার প্রচলিত শব্দাবলী, দ্বিতীয়ত ছন্দ ও তৃতীয়ত ছবি। আমি ছন্দ ও ছবিকেও অন্তর্ভুক্ত করেছি কারন অনেক সময়েই তাঁর রচনার সাথে এ দুটির কোনো একটি বা কখনো দুটিই অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িয়ে থাকে - এগুলি বাদ দিলে রচনাটি আর দাঁড়ায় না। তাঁর ভাষায় অভিধান বহির্ভুত কিছু নামশব্দ আছে যেগুলির নির্দেশ্য-বস্তু (referent) আমাদের পরিচিত জগতে পাওয়া যায়নি। যথাঃ কুমড়োপটাশ, বকচ্ছপ, ল্যাংড়াথেরিয়াম ইত্যাদি। এগুলিকে শুধুই নাম বলে মনে করা যেত। কিন্তু সাথে ছবি থাকায় তা করতে আমাদের বাধা আসে। 'কুমড়োপটাশ' শব্দটি আর তার সাথের ছবিটি মিলে একটা বাস্তবতার সৃষ্টি হয় যাকে এড়ানো যায় না। এমন কথা সাধারন ভাবেই বলা যায়। ঠাকুরমার ঝুলিতে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী আর তাদের নীল নীল ছবিগুলি। অনুরুপভাবে জ্যামিতির টেক্সট-এ বৃত্তের সংজ্ঞা এবং তার চিত্র, পরশুরামের রচনায় কাষ্ঠ কৌপীন এবং তার চিত্র। চিত্র এখানে আবশ্যিক।
সেইমতোই, ছন্দ-ছাড়া হলে কিছু কিছু রচন হয়েও ওঠে না। অসংখ্যের একটি -
'হাসছি কেন কেউ জানে না, পাচ্ছে হাসি হাসছি তাই'। অথবা 'থুরথুরে বুড়ি তার ঝুরঝুরে বাড়ি'।
অসামান্য! তবু আমি হয়তো আরো একটু খুশি হতাম যদি দ্বিতীয়টি এমনি হত -
' ত্থুত্থুরে বুড়ী তার ঝুঝঝুরে বাড়ী'
সে যাই হোক। ছন্দ এখানে আবশ্যিক। যদিও আকর্ষণীয় গদ্য রচনাও আছে, তবু একথা ভেবে দেখার মতো, কেন কৌতুক সৃষ্টিতে 'অসম্ভব' ছন্দের মধ্যেই ভাষা পায়।
শব্দ-ভাষার ক্ষেত্রে মূলত অবশ্য বাংলা শব্দ ব্যবহৃত হলেও, কখনো কখনো পাওয়া যায় এরকমও
'চিমনি-চাটা ভ্যাঁপসা-মুখো ভ্যাঁপাটে।'
অথবা 'দেখবে তখন ছিম্বি ছ্যাঙা চপাটি।'
অভিধান বহির্ভুত শভগুলি, বরং বলব, ধ্বনিগুলি প্রতিবেশি শব্দ ও বাক্যবন্ধের পরিবেশে যেন বাংলা বাংলা মতো হয়ে ওঠে এবং অর্থ পায়।
এছাড়া, সুগঠিত বাংলা শব্দ দিয়েও এমন বাক্যগঠন সম্ভব যা কোন স্বাভাবিক অর্থ পাওয়া যায় না। যেমন এই বাক্যটি -
'বুদ্ধিমান ছোট বড় বৃত্তগুলি বাগবিতন্ডায় ক্লান্ত
হয়ে নিদ্রামগ্ন অবস্থায় সুগন্ধময় দিবাস্বপ্ন দেখছিল।'
এটি সুকুমার রায়ের নয়। তবে অনুরুপ বাক্য তাঁর রচনায় আকছাড় ছড়িয়ে আছে। 'হলদে সবুজ ওরাং ওটাং' স্মরনীয়। বস্তুত এমন বাক্যের নিপুন ব্যবহার তাঁর রচনার অন্যতম মূল ভিত্তি ও আকর্ষণ।
সাধারন ভাষার একটি লক্ষ্য-অর্থ (intended interpretation) থাকে। তবে মনে রাখা দরকার, এই নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছাড়াও ওই একই ভাষার অন্য অর্থও থাকতে পারে, অথবা ঠিকমত বললে, অন্যান্য অর্থও দেওয়া যেতে পারে। আমরা অবশ্য অর্থহীন ভাষার কথাও বলে থাকি (uninterpreted language) - যা ভবিষ্যতে কোনো সম্ভাব্য অর্থ গ্রহনের জন্য অপেক্ষা করে থাকে।
মুশকিল এই যে, নাম-শব্দগুলি যদি জগৎ সংসারের কোনো বস্তু বা বিষয়কে চিহ্নিত না করে তাহলে তাদের অর্থদান হবে কিভাবে? সুকুমার রায় কেন, শুধু 'ফাঁপা-নামশব্দ' (empty term) নিয়ে আমাদের খেলা চলে আসছে আদিকাল থেকে। মনে করা যায় এই শব্দগুলি - পরী, পেগাসাস, পক্ষীরাজ, ভূত, শিব, খোক্কস অথবা যে কোনো গাণিতিক বস্তুর নাম, যেমন বৃত্ত, সরলরেখা, ১০৩৫৩৩২। এগুলি নিয়ে আমাদের কারবার দীর্ধদিনের এবং আশ্চর্যরকম অপরিহার্য। নামশব্দগুলির সাথে ছবি যুক্ত হয়ে তৈরি হয়ে ওঠে অর্থের জগৎ, যেখানে প্রকৃত কুমড়োপটাশের চলাফেরা, মান-অভিমান। একে আজগুবির বা ননসেন্সের জগৎ বলেছেন কেউ কেউ। ঠিকই। তবে যেক্ষেত্রে ভূত, খোক্কস, পরীর জগৎ তো বটেই, প্লেটোর তৈরি গাণিতিক বিশ্বও আজগুবির। 'আজগুবি' জগতের বস্তুগুলির কিছু কিছু চারিত্র্যধর্ম আরোপ করা হয়। কোনো বাক্যের সত্যাসত্য স্থির হয় বাক্যটি সেই ধর্মগুলিকেই বলে কি না তার উপর। বস্তুগুলি যেহেতু নেই, সেগুলি প্রকৃতই অনুরুপভাবে আচরন করে কি না এ প্রশ্ন অবান্তর। প্রসঙ্গত বাট্রান্ড রাসেলের নিম্নলিখিত উদ্ধৃতিটি মনে আসে -
'Mathematics is the subject in which we never know what we are talking about nor whether what we are saying is true.'
গণিত সম্পর্কেই যখন একথা, সুকুমারবাবুর দোষ কি? তাঁর নিজের কথায় -
'নামের সঙ্গে নামীর সাদৃশ্য বা সম্পর্ক যে কোথায়, তাহা আজ পর্যন্ত কেহ নির্দেশ করিতে পারে নাই।' (ভাষার অত্যাচার)
অর্থাৎ ঠিক কোন নিয়মে দুজন নাম ব্যবহারকারী একই নামী-কে সম্পর্কিত করে ফেলেন, তা এখনও অস্পষ্ট। তাই বকচ্ছপের ছবি এঁকে দিতে হয়। তার পরেও একই কথার ঠিক ঠিক একই অর্থোপলব্ধি হয় কিনা বলা যায় না। তবু চেষ্টা করা হতে থাকে। কারণ 'একই কথার অর্থ তোমার আমার কাছে একরকম আর অন্য দশজনের কাছে অন্যরকম এরুপ ঘটিলে ভাষার উদ্দেশ্যই পন্ড হইয়া যায়।' ( ভাষার অত্যাচার ) তাহলে সুকুমার রায়ের আশঙ্কা কাব্য বা ইতিহাস বা বৈজ্ঞানিক গবেষনা একাকার হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। (এখানকার একটু পূর্ণতাপ্রাপ্ত পাঠক ভেবে দেখবেন রামায়ন বা মহাভারতের কাছে আমাদের আশা ঠিক কি এরকমই নয় কি? একই সাথে কাব্য ইতিহাস সমাজবিজ্ঞান।) এত সবের পরেও তিনি লেখেন -'আয়রে ভোলা খেয়াল খোলা' এবং 'আয়রে তবে ভুলের ভবে অসম্ভবের ছন্দেতে।' অসম্ভবও চাই, ছন্দও চাই। আমাদের একজন বন্ধু সুকুমার রায় প্রসঙ্গে সম্প্রতি লিখেছেন - 'শব্দের যেখানে সীমান্ত, তার ওপারে নিশঃব্দ। এই সীমান্ত রেখার গায়ে-গায়ে যে-প্রলম্বিত মধ্যভূমি, সেখানেই নিরর্থের ( ননসেন্সে-এর ) এক্তিয়ার।' সুকুমার রায়ের মধ্যে দুটি ঝোঁকই ছিল বলে মনে হয় - শব্দের সুনির্দিষ্ট অর্থকরন, আবার অর্থের হাত থেকে মুক্তি যাকে একধরনের নৈঃশব্দ্যও বলা চলে। এই দ্বন্দই আমার কাছে স্বাভাবিক লাগে।
এবারে তাঁর সিদ্ধান্ত-নির্মাণের প্রক্রিয়া। যেহেতু ডিম থেকে হাঁস হামেশাই হয়, সেহেতু রুমাল থেকে বেড়াল। এতে আশ্চর্য হবার কি আছে?
এই সিদ্ধান্ত-পদ্ধতিকে analogical শ্রেণীভুক্ত করা যায়, সাদৃশ্যের উপর নির্ভর করে যে পদ্ধতিতে চলন সম্ভব হয়। তবে উপভোগ্য কৌতুকটুকু বাড়তি। ঠিক একই লজিক-এ স্বীকার করে নেওয়া যায় - ফুল ফোটার শব্দ, চাঁদ ডোবা আর বুক ফাটার শব্দ। কৌতুক আর ঘন হয় যখন সেই অনুরুপতা আরো একধাপ এগোয়। ফুল ফোটার শব্দ - ঠাস ঠাস, দ্রুম দ্রাম, পটকা ফাটার মতো। চাঁদ ডোবার শব্দ - গব গব গবাস্। এভাবেই গ্রহনযোগ্য হয় তেত ছায়া-নিমগাছের, মিষ্টি ছায়া-মৌয়াগাছের এবং ব্লটিং পেপার দিয়ে তা শুষে নিতেও বাধা হয় না। এই সিদ্ধান্ত-পদ্ধতির মজা এখানেই যে, সামান্য একটু সাদৃশ্য বা সমাপতন থাকলেই পরবর্তি বাক্যে উপনীত হওয়া চলে অনায়াসে। হযবরল-র সমালোচনা প্রসঙ্গে একসময় বলা হয়েছিল -
'ছোট ছেলেদের এক চিন্তা আর এক চিন্তা হইতে লাফাইয়া লাফাইয়া চলে - তাহাদের ক্ষীণ যে যোগসুত্র থাকে তাহা সবসময় ধরিতে পারা যায় না।' ( প্রবাসী )
আমার তো মনে হয় ক্ষীণতম যোগসুত্র নির্ভর লাফিয়ে চলার এই মানসিক গঠনকর্মে ( mental construction )এ 'বড়'রাও কম দক্ষ বা উৎসুক নন - বাংলার আকাশে বর্ষা বা শরতের মেঘ ভেসে যাওয়া দেখতে দেখতে কোন সে মানুষ যে এই বিচরণ শেখেনি?
দ্বিতীয়ত আত্ম-অস্বীকৃতি (self denial) এক অর্থে আত্মবঞ্চনা। লজিকের এই চিরাচরিত সমস্যাগুলির কথা মনে আসে - যখন একজন ক্রীটদেশীয় বলেন, 'সকল ক্রীটবাসী মিথ্যাবাদী' তখন তিনি সত্যি বলেন না মিথ্যা? অথবা গ্যেডেল যখন প্রমান করেন - কোনো একটি সিস্টেম যদি সুসঙ্গত (consistent) হয়, তাহলে সে কখনই নিজের সুসঙ্গতি প্রমান করতে পারবে না। এইরকম সিদ্ধান্তগঠন প্রক্রিয়ার খুব আকর্ষনিয় নিদর্শন 'লড়াইক্ষ্যাপা'। নোটবইতে পাগলা জগাই লিখেছে -
'- শোনরে জগাই, ভীষন লড়াই হলো
পাঁচ ব্যাটাকে খতম ক'রে জগাই দাদা মোলো।'
জগাই জগাইকে জগাইয়ের মৃত্যুর কাহিনী বলছে।
একটু কম দাবিতে যদি আমরা সন্তুষ্ট হই তাহলে 'খুড়োর কল' অথবা 'বাবুরাম সাপুড়ে'। গদ্য রচনায় এমন উদাহরন 'বাজে গল্প - ১'।
'সেই হইতে দুজনের ছাড়াছাড়ি। কালা বলে - অন্ধটা এমন
জুয়াচোর সে দিনকে রাত করিতে পারে।
অন্ধ বলে - কালাটা যদি নিজের কথা শুনিতে পাইত তবে
বুঝিত সে কত বড় মিথ্যাবাদি।'
এভাবে, আত্ম-অস্বীকৃতি দিয়ে রহস্যময় কূটাভাস (paradox) তৈরি করা বহুকাল ধরে প্রচলিত, এই ক্ষেত্রে তার সাথে যুক্ত হয়েছে কৌতুক। কেন এই কৌতুকের জন্ম হয় একথা কে বলবেন, কবি, শিল্পী না সাইকোলজিস্ট? কেন কারো পতনে কারুন্যের বদলে হাস্যের উদ্রেক হয়?
কেউ কেউ সুকুমার রায়ের রচনা প্রসঙ্গে বলেছেন - 'খাঁটি আজগুবির জগতে যুক্তিহীনতা ও অপ্রাসঙ্গিকতার একছত্র রাজত্ব।' আমার মনে হয় ঠিক তা নয়। আমাদের সামান্য একটু কিছু মেনে নিয়ে শুরু করতে হয়। (axiom এর মতো)। এগুলি প্রকৃত তথ্য থেকে আসতেই হবে, এমন নয়। কল্পনা বা সংস্কার থেকেও হতে পারে - যেমন রুপকথায়, (আহা! কী আশ্চর্য শব্দগুচ্ছটি রুপ-কথা, রুপ গড়ে নিয়ে তার কথা বলা) তারপর থেকে তা নিজের টানে চলে। এই টানের স্বরুপ খুঁজে পাওয়া শক্ত। অর্থাৎ কী একটু অন্যরকম হলে খেয়াল রস ব্যাহত হত? এই টানটা কি শুধু অসম্ভব বস্তু সামগ্রীর মধ্যেই শুধু? না কি ঐ সামগ্রী আর তাদের শ্রোতা-দর্শক-পাঠক মিলিয়ে মিশিয়ে তৈরি হয়? বাঙালী ছাড়া কি আবোলতাবোল সার্থকতা পাবে? অথচ অত্যন্তই আধুনিক এই সৃষ্টিকর্ম; সেই অর্থে পশ্চিমী মনন আর বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতির ফসল।
আমরা এখন একটি মাত্র এরিস্টটলিয়ান লজিক নিয়ে আর সন্তুষ্ট নই।
'In logic there are no morals. Everyone is at liberty to build up his own logic, his own form of language.' (Carnap 1949)
এমন কি আমরা আংশিক সংগতি বা অসংগতির লগিক নিয়েও কথা বলি। সুকুমার চাইছিলেন -
বিড়াল যদি হয় রুমাল-এর লজিক
সামান্য একটু সাজিয়ে নিলেই
হ য ব র ল
এই আর কি!
লজিকের কথা এই পর্যন্ত। একটু পরা-লজিক এবার। কেউ মনে করেন - অর্থ নয় অর্থহীণতাই এর (সুকুমার রায়ের লেখার) উপজীব্য। তা কোনো নৈতিক বা সামাজিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত নয়। কেউ বলেন শব্দ থেকে নিষ্ক্রমন নয়, শব্দকে আক্রমন - নিরর্থক শব্দের বিরুদ্ধে সহাস্য জেহাদ - এইটেই হল তার প্রধান লক্ষ্য। তাঁর সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী এই উক্তি হওয়াটা বিচিত্র নয়।
অর্থ নিয়ে দ্বিচারিতা আমরা দেখেছি। অসংলগ্নতা নিয়ে এত মজাদার খেলা করেও সংগতির যুপকাষ্ঠে (স্বার্থে) হ য ব র ল রচনাটি শেষ পর্যন্ত শুধু একটি স্বপ্ন দেখা হিসেবেই থাকে। এ সংগতি রক্ষার কি কোন প্রয়োজন ছিল? এই বিরোধী সত্তাই কি 'নই আমি কিচ্ছু'তে পরিণতি পায় বা 'তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম'-এ, যা কমবেশি আমরা সকলেই?
এ তো সেই আদ্যিকালের বোধোদয়। এখানেও ইডিওলজি। আরো সিরিয়াস ননসেন্সের জগতে হয়তো পা বাড়াচ্ছিলেন তিনি। তাঁর নিজেরই কথায় 'সিরিয়স ইন্টারেস্ট ইন লাইফ'। কিন্তু জীবন শেষ হল একটু অসময়ে।
সমাপ্ত
Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts
Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts
Thursday, July 26, 2012
দেকার্ত-এর সঙ্গে দশ পা
লেখকঃ মিহির চক্রবর্তী
আমি ভাবছি, তাই আমি অস্তিত্ববান। কেন্দ্রে এই আমি, আমাকে ঘিরে আকাশ বাতাস ভুমন্ডল - প্রতিটি 'আমি' এক একটি ভুমন্ডলের কেন্দ্র। এবং আমি মানেই মানুষ আমি। পক্ষী-আমি নই, বৃক্ষ-আমি নই, নদী-আমি নই।
নদীরা বৃক্ষেরা তো নয়ই, মনুষ্যেতর প্রানীরাও অনুভবহীন, বিচারবোধহীন। তাদের চলাফেরা ঘড়ির কাঁটার মতো, প্রাণস্পন্দনরহিত, তারা অটোমেশন। এই দেকার্ত, আধুনিকতার জনক রেনে দেকার্ত।
বিপরীতে সু-সমাচার-কে স্মরণ করা যেতে পারে এখানে - (দেকার্ত-সৃষ্ট) 'আধুনিক' মানুষ প্রকৃতির অংশ হিসাবে নিজেকে অনুভব করে না, সে নিজেকে বহিরাগত ভাবে এবং মনে করে তার নির্ধারিত কাজ হল প্রকৃতির উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা, তাকে জয় করা।
২
আমার চারপাশে যে ভুমন্ডল তা প্রকৃত কি না জানিনা, জানবার উপায়ও নেই কোনো - "আমি ভেবে নেবো, আকাশ, বাতাস, বর্ণ, আকার, ধ্বনি ইত্যাদি পার্থিব যত এ সব, তা সরলমতি আমাকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে শয়তানের কুহক আর প্রতারণা।" তাই আমার ভুমন্ডল আমার ভাবনার ও বিচারের তন্তু দিয়েই সৃষ্টি করে নিতে হবে।
এই আমি সরিয়ে নিলাম দৃষ্টি।
এই সরিয়ে নিলাম শ্রবণ।
এই গুটিয়ে নিচ্ছি আমার ইন্দ্রিয়সকল।
আমার চিন্তার শরীর থেকে সমস্ত জাগতিক বস্তুর প্রতিকৃতি মুছে ফেলছি। যদি একান্তই তা সম্ভব না হয় মনে করব সে ছবি মিথ্যা। এবং এভাবেই মুখোমুখি হব নিজের, শুধুমাত্র নিজের সাথে বাক্যবিনিময়ের জন্য।
৩
যদিও এই 'ভাবনা' শুধুমাত্র চিন্তন নিয়ে নয়। আমার ভিতরে যা কিছু ক্রিয়াশীল, যা কিছুর ক্রিয়াশিলতা নিয়ে আমরা সচেতন - বিচারবোধ, ইচ্ছে, কল্পনা এবং অনুভব এ সব কিছু জুড়েই আমাদের 'ভাবনা'।
ভাবনা তাই অস্তিত্বও ।
৪
কিন্তু এই অস্তিত্বের উপস্থিতি বিষয়ে নিঃসন্দেহ হই সর্বগ্রাসী এক অবিশ্বাসের ধারা বেয়ে। আমি বোকার মতো, গোঁয়ারের মতো অবিশ্বাস করতে করতে চলেছিলাম -
আমার হাত-কে পা-কে চোখ-কান-স্পর্শকে,
আমার পূর্বসুরিকে, তাদের লেখাপত্র ভাবনারেখাকে।
এভাবে চলতে চলতে এই নিকষ কালাপাহাড় শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করেছে শুধু নিজের অস্তিত্বকে। কারন 'কেউ একজন এই অবিশ্বাসের কর্তা' - এই বোধ নিতান্তই স্বচ্ছ এবং স্পষ্ট ।
তবে বিশ্বাস শুধুমাত্র অস্তিত্বকেই, বর্ণ-গন্ধ-স্পর্শকে নয় - এরা তো স্বপ্নেও আসে।
৫
অস্তিত্ব কি একটি ধর্ম? লাল, চৌকো, মিষ্টি অথবা নরম-এর মতো? যখন বলি 'বৃত্তের পরিধির বিন্দুগুলি থেকে সমদুরবর্তী একটিমাত্র বিন্দু আছে, কেন্দ্র' - অর্থাৎ বৃত্তের একটি ধর্মের অস্তিত্ব বলা হল, তখন বৃত্তের কোনো বাস্তব অস্তিত্বও কি স্বীকার করে নিতে হয়? হয়তো নয়। অর্থাৎ গুনাবলী আছে কিন্তু অস্তিত্বটাতেই সংশয়।
অথচ, আমরা যখন প্রার্থিত পাত্রের গুনাবলী বিজ্ঞাপিত করি - মধ্যবয়সী, পত্নীপরিত্যক্ত, কোমল স্বভাব, ক্ষীণতনু - তখন একথা ভুল করেও বলি না যে পাত্রটিকে অস্তিত্ববানও হতে হবে। অস্তিত্ব ধরেই নেওয়া হয় স্বতঃসিদ্ধের মতো।
৬
রবীন্দ্রনাথ -
'সে বলল, চেহারাখানা হারিয়ে ফেলেছি।' ... ... 'পুপেদিদির ঘরে ভোজ, সকাল সকাল নাইতে গেলাম। বেলা তখন সবেমাত্র দেড়টা। তেলেনিপাড়ার ঘাটে বসে ঝামা দিয়ে কষে মুখ মাজছিলুম। মাজতে মাজতে খেয়াল করিনি শরীরটা উঠে যাচ্ছিল একটু একটু করে। কখন যে উঠে গেল সমস্তটাই।
'চুলকুনি ছিল গায়ে, চুলকোতে গিয়ে দেখি, না আছে নখ না আছে চুলকুনি, ভয়ানক দুঃখ হল। হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলুম, কিন্তু ছেলেবেলা থেকে যে হাউহাউটা বিনামুল্যে পেয়েছিলাম সে গেল কোথায়। যতই চেঁচাই, চেঁচানোও হয় না, কান্না শোনাও যায় না। ইচ্ছে হল মাথা ঠুকি বটগাছটাতে, মাথাটার টিকি খুঁজে পাইনে কোথাও। সবচেয়ে দুঃখ বারোটা বাজল, "খিদে কই" "খিদে কই" বলে পুকুরধারে পাক খেয়ে বেড়াই, খিদে বাঁদরটার চিহ্ন মেলে না।'
দেকার্ত-এর ঠিক বিপরীতটাই চাইছেন রবীন্দ্রনাথ - দেকার্ত যেখানে চাইলেন ধর্মগুলি সরিয়ে সরিয়ে শুধুমাত্র শুদ্ধ 'আছি'তে পৌঁছুতে, 'সে' ব্যাকুল শুধুমাত্র 'আছি' থেকে ধর্মগুলিতে ফিরে যেতে।
৭
অথচ 'আমি আছি'-র যে জোরটা আছে, তা দিয়েই তো কলম্বাস আমেরিকা অভিমুখী হন, মেশিন চলে, জব চার্নক সুতানুটি আসেন, বিদ্যাসাগর ছুটে বেড়ান কলেজ স্ট্রিটের পাড়ায়।
৮
কিন্তু আর একটা কান্নাও তো আছে আমাদের - 'আমি বলে মিলাই আমি আর কিছু না চাই।' এই ক্রমে মিলিয়ে যেতে চাওয়া 'আমি'টার কোন সন্ধান দেকার্ত-এর মধ্যে কোথাও ছিটেফোঁটাও পাওয়া যায় কি না তার খোঁজ করছি এখন।
৯
তাঁর আশ্চর্য মৃত্যুকাহিনী কি কোন কথা বলবে?
- ইয়োরোপের বিখ্যাত বিদ্যালয় ল্য ফ্লেম থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়ে তার প্রধান উপলব্ধি হল প্রথাগত শিক্ষা দিয়ে কিছুই হবে না।
- পৃথিবীর পাঠশালা থেকে নিজের বিচারবোধ যুক্তি নির্ভর পাঠগ্রহনই শুধু তিনি চাইলেন।
- প্যারীতে উল্লাসময় জীবন এবং তার পর পরই অন্তরীন থাকা - পালা করে চলেছে কিছুদিন।
- অতঃপর অবৈতনিক যোদ্ধা হিসেবে সেনা ছাউনিতে 'অহিংস' অবসর যাপন - এবং আশ্চর্য, এই অবকাশে সংগীত বিষয়ক একটি নিবন্ধ রচনা।
- স্থায়ী প্রবাসজীবন তারপর থেকে হলান্ড-এ, মুক্তঞ্জানচর্চার আশায় এবং বিভ্রান্তি ও ভ্রান্তির বিরুদ্ধে লড়াই।
- ১৬৩৩, গ্যালিলেও-র 'ডায়লগ' নিষিদ্ধ ঘোষিত হল, তাঁকে অন্তরীন থাকতে ও সপ্তাহে তিন দিন করে অনুতাপ বাক্য আওড়াতে বাধ্য করা হল। তখন হল্যান্ড -প্রবাসী রেনে দেকার্ত উদ্যোগী হয়েছেন একই তত্ত্বের সমর্থনে ল্য ম্যঁদ গ্রন্থ প্রকাশে।
কিন্তু যেহেতু "প্রতিকুল বাতাসে চলা তাঁর স্বভাব নয়" - তাই ল্য ম্যঁদ-এর মুদ্রণ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিলেন তিনি।
- অতঃপর সুইডেন। রাণী ক্রিশ্চিয়ানা পাঠ নিতে চান দর্শনে ও গণিতে। জাহাজ পাঠিয়েছেন। সাড়া দিলেন তিনি। কেন?
রানী পাঠ নেবেন ভোর পাঁচটায়। দেকার্ত, একটু আলসেমি করেই শুয়ে থাকতে ভালোবাসতেন সারা সকালটা, সেভাবেই তাঁর অসামান্য ভাবনাগুলি জমতে থাকত। তিনি পছন্দ করতেন উষ্ণতা, শারীরিক ঊষ্ণতা, স্টোভের প্রায় মধ্যেই বসে কাটাতে ভালোবাসতেন শীতকালটা।
এই দেকার্ত, রানীর ডাকে, অথবা টানে, ভোর পাঁচটায় সুইডেনের রাস্তা ধরে চলেছেন দিনের পর দিন।
অবশেষে এভাবেই মারা গেলেন নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫৪ বছর বয়েসে, ১৬৫০-এ।
- অথচ তিনি ১৬৩৮-এর জানুয়ারিতে লিখছেন, একশো বছরের বেশি বেঁচে থাকতে চান; জুন-এ লিখছেন, সত্তর বছর বাঁচলেই চলবে। এবং ১৬৪৫-এ বেঁচে থাকাকে টিকিয়ে রাখার চেয়ে ভালো এবং সহজ আর একটি পদ্ধতি তিনি আবিস্কার করেছেন - মৃত্যুকে ভয় না পাওয়া।
১০
কোনো বৌদ্ধ দার্শনিক তাঁর পরিচিতদের কাছে লিখেছিলেন, 'আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানাই আমি অমুক দিন থেকে দেহ রাখছি।'
দুঃখ নয়, পরিতাপ নয়, কোনো অন্তিম ইচ্ছের কথা নয়, একটি বিজ্ঞপ্তি শুধু। এবং তিনি মারা গেলেন।
সমাপ্ত
আমি ভাবছি, তাই আমি অস্তিত্ববান। কেন্দ্রে এই আমি, আমাকে ঘিরে আকাশ বাতাস ভুমন্ডল - প্রতিটি 'আমি' এক একটি ভুমন্ডলের কেন্দ্র। এবং আমি মানেই মানুষ আমি। পক্ষী-আমি নই, বৃক্ষ-আমি নই, নদী-আমি নই।
নদীরা বৃক্ষেরা তো নয়ই, মনুষ্যেতর প্রানীরাও অনুভবহীন, বিচারবোধহীন। তাদের চলাফেরা ঘড়ির কাঁটার মতো, প্রাণস্পন্দনরহিত, তারা অটোমেশন। এই দেকার্ত, আধুনিকতার জনক রেনে দেকার্ত।
বিপরীতে সু-সমাচার-কে স্মরণ করা যেতে পারে এখানে - (দেকার্ত-সৃষ্ট) 'আধুনিক' মানুষ প্রকৃতির অংশ হিসাবে নিজেকে অনুভব করে না, সে নিজেকে বহিরাগত ভাবে এবং মনে করে তার নির্ধারিত কাজ হল প্রকৃতির উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা, তাকে জয় করা।
২
আমার চারপাশে যে ভুমন্ডল তা প্রকৃত কি না জানিনা, জানবার উপায়ও নেই কোনো - "আমি ভেবে নেবো, আকাশ, বাতাস, বর্ণ, আকার, ধ্বনি ইত্যাদি পার্থিব যত এ সব, তা সরলমতি আমাকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে শয়তানের কুহক আর প্রতারণা।" তাই আমার ভুমন্ডল আমার ভাবনার ও বিচারের তন্তু দিয়েই সৃষ্টি করে নিতে হবে।
এই আমি সরিয়ে নিলাম দৃষ্টি।
এই সরিয়ে নিলাম শ্রবণ।
এই গুটিয়ে নিচ্ছি আমার ইন্দ্রিয়সকল।
আমার চিন্তার শরীর থেকে সমস্ত জাগতিক বস্তুর প্রতিকৃতি মুছে ফেলছি। যদি একান্তই তা সম্ভব না হয় মনে করব সে ছবি মিথ্যা। এবং এভাবেই মুখোমুখি হব নিজের, শুধুমাত্র নিজের সাথে বাক্যবিনিময়ের জন্য।
৩
যদিও এই 'ভাবনা' শুধুমাত্র চিন্তন নিয়ে নয়। আমার ভিতরে যা কিছু ক্রিয়াশীল, যা কিছুর ক্রিয়াশিলতা নিয়ে আমরা সচেতন - বিচারবোধ, ইচ্ছে, কল্পনা এবং অনুভব এ সব কিছু জুড়েই আমাদের 'ভাবনা'।
ভাবনা তাই অস্তিত্বও ।
৪
কিন্তু এই অস্তিত্বের উপস্থিতি বিষয়ে নিঃসন্দেহ হই সর্বগ্রাসী এক অবিশ্বাসের ধারা বেয়ে। আমি বোকার মতো, গোঁয়ারের মতো অবিশ্বাস করতে করতে চলেছিলাম -
আমার হাত-কে পা-কে চোখ-কান-স্পর্শকে,
আমার পূর্বসুরিকে, তাদের লেখাপত্র ভাবনারেখাকে।
এভাবে চলতে চলতে এই নিকষ কালাপাহাড় শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করেছে শুধু নিজের অস্তিত্বকে। কারন 'কেউ একজন এই অবিশ্বাসের কর্তা' - এই বোধ নিতান্তই স্বচ্ছ এবং স্পষ্ট ।
তবে বিশ্বাস শুধুমাত্র অস্তিত্বকেই, বর্ণ-গন্ধ-স্পর্শকে নয় - এরা তো স্বপ্নেও আসে।
৫
অস্তিত্ব কি একটি ধর্ম? লাল, চৌকো, মিষ্টি অথবা নরম-এর মতো? যখন বলি 'বৃত্তের পরিধির বিন্দুগুলি থেকে সমদুরবর্তী একটিমাত্র বিন্দু আছে, কেন্দ্র' - অর্থাৎ বৃত্তের একটি ধর্মের অস্তিত্ব বলা হল, তখন বৃত্তের কোনো বাস্তব অস্তিত্বও কি স্বীকার করে নিতে হয়? হয়তো নয়। অর্থাৎ গুনাবলী আছে কিন্তু অস্তিত্বটাতেই সংশয়।
অথচ, আমরা যখন প্রার্থিত পাত্রের গুনাবলী বিজ্ঞাপিত করি - মধ্যবয়সী, পত্নীপরিত্যক্ত, কোমল স্বভাব, ক্ষীণতনু - তখন একথা ভুল করেও বলি না যে পাত্রটিকে অস্তিত্ববানও হতে হবে। অস্তিত্ব ধরেই নেওয়া হয় স্বতঃসিদ্ধের মতো।
৬
রবীন্দ্রনাথ -
'সে বলল, চেহারাখানা হারিয়ে ফেলেছি।' ... ... 'পুপেদিদির ঘরে ভোজ, সকাল সকাল নাইতে গেলাম। বেলা তখন সবেমাত্র দেড়টা। তেলেনিপাড়ার ঘাটে বসে ঝামা দিয়ে কষে মুখ মাজছিলুম। মাজতে মাজতে খেয়াল করিনি শরীরটা উঠে যাচ্ছিল একটু একটু করে। কখন যে উঠে গেল সমস্তটাই।
'চুলকুনি ছিল গায়ে, চুলকোতে গিয়ে দেখি, না আছে নখ না আছে চুলকুনি, ভয়ানক দুঃখ হল। হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলুম, কিন্তু ছেলেবেলা থেকে যে হাউহাউটা বিনামুল্যে পেয়েছিলাম সে গেল কোথায়। যতই চেঁচাই, চেঁচানোও হয় না, কান্না শোনাও যায় না। ইচ্ছে হল মাথা ঠুকি বটগাছটাতে, মাথাটার টিকি খুঁজে পাইনে কোথাও। সবচেয়ে দুঃখ বারোটা বাজল, "খিদে কই" "খিদে কই" বলে পুকুরধারে পাক খেয়ে বেড়াই, খিদে বাঁদরটার চিহ্ন মেলে না।'
দেকার্ত-এর ঠিক বিপরীতটাই চাইছেন রবীন্দ্রনাথ - দেকার্ত যেখানে চাইলেন ধর্মগুলি সরিয়ে সরিয়ে শুধুমাত্র শুদ্ধ 'আছি'তে পৌঁছুতে, 'সে' ব্যাকুল শুধুমাত্র 'আছি' থেকে ধর্মগুলিতে ফিরে যেতে।
৭
অথচ 'আমি আছি'-র যে জোরটা আছে, তা দিয়েই তো কলম্বাস আমেরিকা অভিমুখী হন, মেশিন চলে, জব চার্নক সুতানুটি আসেন, বিদ্যাসাগর ছুটে বেড়ান কলেজ স্ট্রিটের পাড়ায়।
৮
কিন্তু আর একটা কান্নাও তো আছে আমাদের - 'আমি বলে মিলাই আমি আর কিছু না চাই।' এই ক্রমে মিলিয়ে যেতে চাওয়া 'আমি'টার কোন সন্ধান দেকার্ত-এর মধ্যে কোথাও ছিটেফোঁটাও পাওয়া যায় কি না তার খোঁজ করছি এখন।
৯
তাঁর আশ্চর্য মৃত্যুকাহিনী কি কোন কথা বলবে?
- ইয়োরোপের বিখ্যাত বিদ্যালয় ল্য ফ্লেম থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়ে তার প্রধান উপলব্ধি হল প্রথাগত শিক্ষা দিয়ে কিছুই হবে না।
- পৃথিবীর পাঠশালা থেকে নিজের বিচারবোধ যুক্তি নির্ভর পাঠগ্রহনই শুধু তিনি চাইলেন।
- প্যারীতে উল্লাসময় জীবন এবং তার পর পরই অন্তরীন থাকা - পালা করে চলেছে কিছুদিন।
- অতঃপর অবৈতনিক যোদ্ধা হিসেবে সেনা ছাউনিতে 'অহিংস' অবসর যাপন - এবং আশ্চর্য, এই অবকাশে সংগীত বিষয়ক একটি নিবন্ধ রচনা।
- স্থায়ী প্রবাসজীবন তারপর থেকে হলান্ড-এ, মুক্তঞ্জানচর্চার আশায় এবং বিভ্রান্তি ও ভ্রান্তির বিরুদ্ধে লড়াই।
- ১৬৩৩, গ্যালিলেও-র 'ডায়লগ' নিষিদ্ধ ঘোষিত হল, তাঁকে অন্তরীন থাকতে ও সপ্তাহে তিন দিন করে অনুতাপ বাক্য আওড়াতে বাধ্য করা হল। তখন হল্যান্ড -প্রবাসী রেনে দেকার্ত উদ্যোগী হয়েছেন একই তত্ত্বের সমর্থনে ল্য ম্যঁদ গ্রন্থ প্রকাশে।
কিন্তু যেহেতু "প্রতিকুল বাতাসে চলা তাঁর স্বভাব নয়" - তাই ল্য ম্যঁদ-এর মুদ্রণ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিলেন তিনি।
- অতঃপর সুইডেন। রাণী ক্রিশ্চিয়ানা পাঠ নিতে চান দর্শনে ও গণিতে। জাহাজ পাঠিয়েছেন। সাড়া দিলেন তিনি। কেন?
রানী পাঠ নেবেন ভোর পাঁচটায়। দেকার্ত, একটু আলসেমি করেই শুয়ে থাকতে ভালোবাসতেন সারা সকালটা, সেভাবেই তাঁর অসামান্য ভাবনাগুলি জমতে থাকত। তিনি পছন্দ করতেন উষ্ণতা, শারীরিক ঊষ্ণতা, স্টোভের প্রায় মধ্যেই বসে কাটাতে ভালোবাসতেন শীতকালটা।
এই দেকার্ত, রানীর ডাকে, অথবা টানে, ভোর পাঁচটায় সুইডেনের রাস্তা ধরে চলেছেন দিনের পর দিন।
অবশেষে এভাবেই মারা গেলেন নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫৪ বছর বয়েসে, ১৬৫০-এ।
- অথচ তিনি ১৬৩৮-এর জানুয়ারিতে লিখছেন, একশো বছরের বেশি বেঁচে থাকতে চান; জুন-এ লিখছেন, সত্তর বছর বাঁচলেই চলবে। এবং ১৬৪৫-এ বেঁচে থাকাকে টিকিয়ে রাখার চেয়ে ভালো এবং সহজ আর একটি পদ্ধতি তিনি আবিস্কার করেছেন - মৃত্যুকে ভয় না পাওয়া।
১০
কোনো বৌদ্ধ দার্শনিক তাঁর পরিচিতদের কাছে লিখেছিলেন, 'আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানাই আমি অমুক দিন থেকে দেহ রাখছি।'
দুঃখ নয়, পরিতাপ নয়, কোনো অন্তিম ইচ্ছের কথা নয়, একটি বিজ্ঞপ্তি শুধু। এবং তিনি মারা গেলেন।
সমাপ্ত
আকাশকুসুমের অধিকার
লেখকঃ মিহির চক্রবর্তী
গণিতশিল্পী ছাড়া 'আকাশকুসুম'-এর চাষ-আবাদ করার ক্ষমতা ও দুঃসাহস বিজ্ঞান জগতের আর কোন সাধকের থাকতে পারে? বিজ্ঞান জগতের বাইরে (সত্যিই বাইরে কি?) হয়তো আছে কবির, হয়তো শিল্পীর।
তবে রবীন্দ্রনাথ দিয়েই শুরু করি কথকতা। এমন রসিক পাগল আর কে আছেন? তাঁরই একটি ছোট্ট রচনা 'পাগল' --
'পাগল শব্দটা আমাদের কাছে, ঘৃণার শব্দ নহে। খ্যাপা নিমাইকে আমরা খ্যাপা বলিয়া ভক্তি করি; আমাদের খ্যাপা দেবতা মহেশ্বর।'
আমরা শব্দটিকে পাগলা গারদে পাঠিয়ে নিষ্কৃতি খুঁজি না। আমাদের বাউলরা তো নিজেদের 'খ্যাপা'ই বলেন। এরই সাথে যে শব্দটি তা 'সুখ' নয় 'আনন্দ'।
'সুখ প্রতিদিনের সামগ্রী, আনন্দ প্রত্যহের অতীত। সুখ শরীরে কোথাও পাছে ধুলা লাগে বলিয়া সংকুচিত, আনন্দ ধুলায় গড়াগড়ি দিয়া নিখিলের আপনার ব্যবহার ভাঙিয়া চুরমার করিয়া দেয়। ... সুখ বাহিরের নিয়মে বদ্ধ, আনন্দ সে বন্ধন ছিন্ন করিয়া আপনার নিয়ম আপনিই সৃষ্টি করে।'
খ্যাপা সুখ-প্রত্যাশী নয়, অন্যের তৈরী নিয়মে নিজেকে সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে রাজী হয় না সে।
'যাহা রহিয়াছে, যাহা আছে, তাহাকেই চিরস্থায়ীরূপে রক্ষা করিবার জন্য সংসারে একটা বিষম চেষ্টা রহিয়াছে; ইনি সেটাকে ছারকার করিয়া দিয়া, যাহা নাই তাহার জন্য পথ করিয়া দিতেছেন। ইঁহার হাতে বাঁশী নাই, সামঞ্জস্য সুর ইঁহার নহে; পিনাক বাজিয়া ওঠে, বিধিবিহিত যঞ্জ নষ্ট হইয়া যায়, এবং কোথা হইতে একটি অপুর্বতা উড়িয়া আসিয়া জুড়িয়া বসে।'
অন্যদের 'বিষয়' নিতান্তই 'বাস্তব'। পদার্থবিদ্যার- জড়পদার্থ, তার মধ্যেকার অণুপরমাণু, তাদের গতিময়তা ও টানাপোড়েন, বটানিস্টের- উদ্ভিদ, তার বৈচিত্র, তার জন্ম-মৃত্যু, জীববিজ্ঞানীজীবজগৎ, তাদের ভালবাসা, তাদের বাঁচার নিয়মাবলী। বিষয় জ্ঞাতার বাইরে, তার অস্তিত্ব জ্ঞাতা-নিরপেক্ষ এবং প্রচেষ্ঠা থাকে বিষয় সম্পর্কে জ্ঞাতা-নিরপেক্ষ জ্ঞান অনুসন্ধানের। এ জ্ঞানের রূপ বাক্যবিন্যাসে, যে বাক্য উচ্চারিত হওয়ার আগেই সত্য অথবা মিথ্যা হয়ে যাচ্ছে। কোনো এক সময় ভাষা ছিল না, কিন্তু বিস্ময় ছিল। তারপর এক মহালগ্নে আমরা প্রথম উচ্চারণ করতে জানলাম 'সুর্য', 'পৃথিবী', 'আবর্তন'। প্রথম প্রকৃতিপাঠক বললেন 'সুর্য পৃথিবীকে ঘিরে আবর্তিত হয়'। মিথ্যে হয়েই জন্ম নিল বাক্যটি। (আজকাল অনেকেই এসবে, এই জ্ঞাতা-নিরপেক্ষতায়, সন্দিহান, জানি, তবু তা এখনো সন্দেহেই। ভাবনার মূল কাঠামোয় তেমন কোনো বদল ঘটেছে বলে মনে হয় না।)
বিপরীতে গণিতসাধকের জ্ঞেয় বিষয় তাঁর মনের মধ্যেই, তাঁর কল্পনায়। একটি কাগজে, রুলার দিয়ে একটি রেখা আঁকা হল। গণিতবিদ তার বাইরে অবস্থিত এই বস্তু রূপটিকে অন্য সকলের মতই দেখেন। কিন্তু এটিই তাঁর বিষয় নয়। তাঁর কল্পনায় তিনি এবার রেখাটির বাস্তব প্রস্থকে মুছে ফেলতে ফেলতে তাকে একেবারে সীমায় ঠেলে নিয়ে যান। আবার অন্যদিকে রেখাটি দুদিকেই প্রসারিত করতে থাকেন যে কোনো সীমা অতিক্রম করে। কল্পনার এই খেলায় কাগজের উপরকার বাস্তব, সীমায়িত, প্রস্থবান রেখাটি অন্য রূপ যায়- এ রূপ আর বাইরে নেই, সমস্তটাই গণিতশিল্পীর মনে। এই যে বিষয়কে মনে মনে গড়ে নেওয়া, বাস্তবতা থেকে অবাস্তবতায় প্রসারিত করা, এই কাজে গণিতবিদকে একজন শিল্পী বা কারিগর বলে মনে হতেই পারে। বাইরের বস্তুটি নয়, সেই বস্তুটি বা বস্তুর আভাসটিকে কেন্দ্রে নিয়ে গড়ে তোলা মানসপ্রতিমা; এবং এই গড়ে তোলা গণিতস্রষ্টারই মনের কারুকাজ দিয়ে। নতুন এই রহস্যময়, রূপটিকে এবারে তিনি বরণ করে নেন তার 'বিষয়' হিসাবে এবং যথেষ্ট বিস্ময়ে তাকে, সেই বিষয়কে, পর্যবেক্ষণ করেন। বিষয়টিকে তার রহস্যাবৃত মনে হয় এবং এই রহস্যের উন্মোচন তাঁর কাছে অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
এভাবেই গড়ে ওঠে একটি নতুন রূপ, যা বস্তুত গণিতস্রষ্টার মনেরই সৃষ্টি, যার কাছে স্রষ্টা নিজেই আবার নতজানু, যেভাবে একজন প্রকৃতিবিজ্ঞানী নতজানু প্রকৃতির কাছে।
প্রকৃতিবিজ্ঞানীর সঙ্গে প্রকৃতির একটি খেলা চলে। বিজ্ঞানী এই খেলায় একজন বুদ্ধিমান কল্পনাক্ষম প্রার্থী - প্রার্থী তাঁর বিষয় প্রকৃতির কাছে। গনিতবিদও এই ধরনের এক খেলাতেই লিপ্ত হন। তবে তার খেলার সামগ্রী তিনি গড়ে নেন নিজেই।
( এ সামগ্রী কতটা স্রষ্টা নির্ভর? বাস্তব রেখাটি থেকে উদ্ভুদ এই যে নতুন রূপ, এর মধ্যে কি একটি উনিভার্সালিটি থাকে? সকল সুস্থ কল্পনাশীল মানুষই মনের এই কারিগরিতে পারদর্শী, সকলেই সেই আইডিয়াল রেখা-রূপটি মনের আর্শীতে দেখতে সক্ষম।
প্লেটো বলবেন অন্যভাবে। তিনি বলবেন, এই রূপটিই বাস্তব। The so called real world of experience is not at all real. We are like dwellers in a cave, who perceive the shadows of the external world and mistake the shadow for the real thing. )
তখনই অপরিহার্য হয়ে পড়ে কথা। অন্য বিজ্ঞানী তাঁর বিষয় দেখিয়ে দিতে পারেন, যেমন - এই একটি বৃক্ষ, অথবা এই একটুকরো উল্কাপিন্ড, অথবা এমনকি, এই একটি ইলেক্ট্রন। বিষয় উপস্থাপনার জন্য কথা তাঁর ক্ষেত্রে অপরিহার্য নয়। কথাত ভুমিকা দ্বিতীয় পর্যায়ে, বিষয়-এর জ্ঞানের বাহক হিসাবে।
কিন্তু গণিতের বিষয় মানেই একটি বা কয়েকটি গুনের বর্ণনা - বিন্দু; যার অবস্থান আছে অথচ পরিমাপ নেই; সংখ্যা - কোনো বস্তুসমষ্টির সেই ধর্ম যা পড়ে থাকেই বস্তুগুলি থেকে তাদের সমস্ত বিশেষ গুনাবলী, যেমন রঙ, আকার, গন্ধ বা এমনি সবকিছু, সরিয়ে নিলেও।
কথার মতো শক্তিমান অ-বাস্তব আর কী আছে? কয়েকটি ধ্বনি দিয়ে অথবা চিহ্ন দিয়ে পর পর সাজিয়ে তোলা একট পরম্পরা, একান্তই এবস্ট্রাক্ট গঠন একটি, কঈ মায়ার খেলায় জড়িয়ে ফেলেছে মানুষকে, ধ্বনির গঠন আবার তৎক্ষনাৎ বিলুপ্ত হয়ে যায়।
অন্যদের ক্ষেত্রে বিষয়ের অস্তিত্বের পরেই তার বর্ণনা আসে। এখানে বর্ণনা দিয়েই বিষয়ের সৃষ্টি।
(তুলনা - বিষয় ; মৎসকন্যা = মাছের শরীর, মানুষীর মুখ, জলে ভেসে বেড়ায়।) বাইরে নেই। মনে আছে। ভালবাসায় আছে।
রবীন্দ্রনাথের 'সে' মনে পড়ে? 'পুপে দিদিমনিকে ধারা বেয়ে যে গল্প বলে যাচ্ছি সেই গল্পের মূল অবলম্বন একটি সর্বনামধারী, সে কেবলমাত্র বাক্য দিয়ে তৈরী।'
এই এবস্ট্রাকশন এবং বাণী-নির্ভরতার ফলে axiomatization হয়ে পড়ে গণিতের গঠনপ্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ।
কয়েকটি বাক্য উপস্থিত করা হয় খেলার টেবিলে। ধরে নেওয়া হয় কিছু সামগ্রী আছে যারা ঐ বাক্যে উল্লেখিত গুনাবলির আধার। বেশ ভালো হয় ইতিপুর্বে গঠিত কিছু গণিত-সামগ্রীর যদি ঐ গুনাবলী থাকে। স্বাভাবিকভাবেই, গণিতের ইতিহাসের প্রথম সৃষ্ট axiom-গুলির জন্য ঈপ্সিত আদিম সামগ্রীগুলির প্রামান্য নয়। খানিকটা বোধ বা কান্ডজ্ঞাণের ওপর ছেড়ে দিতে হয় এদের অস্তিত্বকে।
যেমন ইউক্লিডিয় জ্যামিতির axiom-গুলি অথবা পিয়ানোর সংখ্যাসুংক্রান্ত axiom-গুলি। প্রথম গুচ্ছকে ধারন করার জন্য আছে বিন্দু, সরলরেখা ইত্যাদি জ্যামিতির অবাস্তব বস্তুগুলি। আর দ্বিতীয় গুচ্ছের জন্য বিমুর্ত পূর্ণ সংখ্যার দল।
এইভাবেই বাস্তব বস্তু থেকে কল্পনায় এবং তার পরে সে কল্পনার বাণীরূপ। অথবা বাস্তব বস্তুর আভাস থেকে কথা এবং কথা থেকে কল্পনায় এক রূপের অবয়ব গড়ে তোলা।
ঠিক এখানেই সেই পুরনো প্রশ্নটি এসে যায়। কথা ছাড়া মানুষ কী ভাবনা করতে পারে? বাণীহীন অর্থাৎ ভাষা গড়ে ওঠেনি যাদের তারা কি কল্পনা করতে পারে? ভাবতে পারে? অন্তত স্ট্রাকচারড বিমুর্ত ভাবনা? গণিতের মতো ভাবনা?
প্রাথমিক গঠনের পরে যে এবস্ট্র্যাকট রূপটি তৈরি হল তার কিছু নির্দিষ্ট গুনাবলী আসে। এই অবাস্তব বস্তুগুলির 'সত্য কাহিনী' সেগুলি।
সে গুনাবলীর 'আবিস্কার'ও গণিতকর্মির কাজ, দ্বিতীয় পর্যায়ের। এই অনুসন্ধানের জন্য ল্যাবরেটরি সাজাতে হয় তাঁকে - যে ল্যাবরেটরির মূল মন্ত্র হল লজিক এবং পদ্ধতি হল গাণিতিক প্রমানের মধ্য দিয়ে যাওয়া। প্রমানপদ্ধতি মাত্রেই এবস্ট্রাক্ট। সুর্যের আকৃতি গোলাকার - এর প্রমাণ সরাসরি, প্রকৃত তথ্য খোঁজার মধ্য দিয়ে। কিন্তু ত্রিভুজের কোনের সমদ্বিখন্ডক তিনটি একই বিন্দু দিয়ে যায় - একথার প্রমান যুক্তি-তর্ক দিয়ে করতে হয়। এই বিমুর্ত কথা চলাচলের মধ্য দিয়ে যে সিদ্ধান্ত আসে তা এত অমোঘ, এত সন্দেহাতীত মনে হয় কেন - এটা এক বিষ্ময়।
ফলত গণিত জগতের বিচরণকারীর কাজ দ্বিবিধ;
শিল্পী হিসাবে - আশ্চর্য, অসম্ভব, সুন্দর রূপের নির্মাণ।
আবিস্কারক হিসাবে - সেই নির্মিত রূপের অজ্ঞাত গুণাবলীর অনুসন্ধান।
অজ্ঞাত গুণাবলীর আবিস্কারের পদ্ধতিটি আরো একটু খুঁটিয়ে দেখা যাক। Axiom-গুলি দিয়ে রূপ নির্মানের পর নির্মাতার দায়িত্ব মূলত শেষ, যদিও রূপের মুল এককগুলি সাজিয়ে অন্যান্য বিচিত্র মিশ্র রূপ সৃষ্টির কাজেও শিল্পীসত্তাই ক্রিয়াশীল। সীমাবদ্ধ রেখা আর বিন্দু-রূপ দিয়ে যেমন বৃত্ত-রূপ, topological space এবং group মিলিয়ে যেমন topoligical group ।
এরপর আবিস্কারক হিসাবে গণিতকর্মির কাজের শুরু। তিনি তখন একের পর এক সৃষ্ট রূপগুলির গুণনির্দেশক বাক্য (কথার মাহাত্য আবার লক্ষনীয়) উপস্থাপিত করেন এবং প্রশ্ন করেন, এ কি সত্যি না মিথ্যে? সত্যি, মিথ্যে শব্দ দুটি বহির্বিশ্বের জ্ঞানের ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য হয়। গণিতের ক্ষেত্রে বরং বলা ভালো বাক্যটি প্রামান্য না অ-প্রামান্য। এতদিনের বিশ্বাস ছিল একটি অথবা অন্যটি হতে বাধ্য। সম্প্রতি তিরিশের দশকের পর থেকে গ্যেডেলের অসম্পুর্ণতা তত্ত্ব এসে যাওয়ার পরে, একটি তৃতীয় সম্ভাবনাও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন গণিত-পথিকেরা - তা হল প্রামান্য বা অ-প্রামান্য কোনোটিই নয়। তাছাড়া অনিশ্চিতির আরো একটি কারন, গাণিতিক প্রমান পদ্ধিতিতেও বিভিন্নতার উপস্থিতি। একই গাণিতিক রূপ থেকে ভিন্ন ভিন্ন প্রমান
গাণিতিক প্রমান এক জাতীয় পদ্ধতি, বিগত এক শতকেরও বেশি সময় ধরে যার গ্রহনযোগ্যতা এবং মর্যাদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্ঞানের অন্য ক্ষেত্রেগুলিতেও, পদার্থবিদ্যায় তো বটেই, এই পদ্ধতির প্রয়োগ এক লাফে সম্মান বাড়িয়ে তোলে। 'Understanding means understanding through mathematics', গণিতের অপর নাম র্যাশনালিটির অপর নাম গণিত। সকলেই জানেন অধিকাংশ গণিতজ্ঞের আচরন অস্বাভাবিক তবুও।
ফলে 'বিজ্ঞানের রানী' যে কোনো অন্য জ্ঞানের 'পরিচারিকা' ইয় পরিনতিলাভ। Non-standard analysis-কে অধ্যাপক William F. Tayor কি চোখে দেখেন তার নমুনাঃ That subject looks very interesting to me, and I wish I could take out the time to master it. There are numerous places in my field where one is confronted with the things that are going on simultaneously at totally different size scales. They are very difficult to deal with by conventional methods. Perhaps non-standard analysis with its infinitesimals might provide a handle of sort of things.
টেলর ইঞ্জিনিয়ারিং-এর একজন প্রথম সারির ব্যাক্তিত্ব। কোনো আশ্চর্য গণিতাংশকে প্রায়ই এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় - 'কী হবে এ দিয়ে?'
প্রশ্ন হয় না ; 'কেমন লাগছে একে?'
কেন? কেন গণিতের অন্য নাম র্যাশনালিটি? 'Quantitative science - that is science with mathematics - has proved successful in controlling nature. The majority of the society backs it up for this reason. At the present moment, they want nature to be altered and controlled - to the extent, of course, that we can do it and the results are felicitous. The humanist point of view is a minority point of view. But it is influencial - one sees this among young people' - ১৯৭৭ - এর আগস্ট মাসে অধ্যাপক টেলরের এই সাক্ষাৎকার। আমি আরো লক্ষ করতে বলি ঐ 'humanist point of view' শব্দগুচ্ছকে।
কে কথা বলছে? ক্ষমতা। মেজরিটি প্রকৃতপক্ষে - ক্ষমতাবান গোষ্ঠী, অথবা মেজরিটির অর্থ গতানুগতিকতা। টেলর-এর কাছে সুন্দর তখনই যখন তা কোনো ব্যবহারে লাগে। গণিত সুন্দর ততক্ষনই, রানী ততক্ষনই যতক্ষন তা ব্যবহার্্য।
গণিতকে বেরিয়ে আসতেই হবে এই স্তাবকতার তাহ থেকে, স্তাবকতার আড়ালে লুকোনো লোভী দৃষ্টি থেকে। বিজ্ঞাপন, বাজার, ব্যবসা ও ব্যবহারের বাইরে থেকে তার নিজের, শুধুমাত্র সৈন্দর্যের কোণতিতে তাকে ফিরতেই হবে। ব্যবহারিকেরা আসুন সবিনয়ে, মুগ্ধতা নিয়ে, এবং ভালোবেসে।
সমস্ত জ্ঞানের পদ্ধতির চুড়ান্ত শুদ্ধ রূপ গাণিতিক পদ্ধতি - এই বোধ ও বিশ্বাসে একটু ভাঙন ধরেছে ইদানীং। এর অন্যান্য কারনের মধ্যে, আমার মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ অন্যতর হল, প্রচলিত গণিতের ভিত্তি ও পদ্ধতিতে গণিতের অন্তর্জগত থেকেই উদ্ভুত সন্দেহ। এই সন্দেহের মুখে দাঁড়িয়ে গণিত এতদিনকার অদ্বৈততা হারিয়ে ফেলছে। সে শতধারায় বিভক্ত- আমি বলতে চাই বিকশিত। বিকল্প গণিতেরা দাবি নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। মূল স্রোতটি অবশ্যই অদ্বৈততার রক্ষক, কারণ স্পষ্টতই পায়ের তলার ভূমি। আর বিভিন্ন ক্ষীণ, অতিক্ষীণ, বিদ্রোহী, অবার্চীন ধারাগুলির ক্রমাগত আবির্ভাব। কা বাঁচে কে হারায় সে প্রশ্ন এই ক্ষণে অর্থহীন। ধারাগুলি যেন স্বাভাবিক পরিণতি পেতে পারে- সভ্যতার দায়ে এটুকুই হওয়া উচিত। তাকে যেন স্বাভাবিক জল-হাওয়া থেকে বঞ্চিত না করা হয়। এ দায়িত্ব পালন করছে কই সভ্যতা? আর এই যে যেটুকু আত্মপ্রকাশনার সুযোগ পাচ্ছে বিভিন্ন বিকল্প গণিত তার পিছনেও ঐ ব্যবসা- এবং ভবিষৎ ব্যবহার্যতার সম্ভাবনা- আমার বিশ্বাস তাই।
আমার কাছে একটা দায় এসে পড়ে। 'আকাশকুসুম' রচনার অধিকার প্রতিষ্ঠার দায়। গণিতের মূল ধারা আকাশকুসুমকে স্বীকার করেও তার আকার-বর্ণ গন্ধের সীমানা সুনির্ধারিত করে দেয়। তাই অস্বীকার এই মূল স্রোতকে। আর রাষ্ট্র-সমাজ-ব্যবসা-টেকনোলজি-উপযোগিতার নিক্তিতে মাপছে সব কিছু। অবার্চীনতার সামান্য স্থান এখানে। অস্বীকার তাকেও, সে কারণে।
বস্তুত ক্রমাগত আকাশকুসুম রচনা করে করেই এই অস্বীকারের একটা বাস্তবতাও তৈরি হবে।
সমাপ্ত
গণিতশিল্পী ছাড়া 'আকাশকুসুম'-এর চাষ-আবাদ করার ক্ষমতা ও দুঃসাহস বিজ্ঞান জগতের আর কোন সাধকের থাকতে পারে? বিজ্ঞান জগতের বাইরে (সত্যিই বাইরে কি?) হয়তো আছে কবির, হয়তো শিল্পীর।
তবে রবীন্দ্রনাথ দিয়েই শুরু করি কথকতা। এমন রসিক পাগল আর কে আছেন? তাঁরই একটি ছোট্ট রচনা 'পাগল' --
'পাগল শব্দটা আমাদের কাছে, ঘৃণার শব্দ নহে। খ্যাপা নিমাইকে আমরা খ্যাপা বলিয়া ভক্তি করি; আমাদের খ্যাপা দেবতা মহেশ্বর।'
আমরা শব্দটিকে পাগলা গারদে পাঠিয়ে নিষ্কৃতি খুঁজি না। আমাদের বাউলরা তো নিজেদের 'খ্যাপা'ই বলেন। এরই সাথে যে শব্দটি তা 'সুখ' নয় 'আনন্দ'।
'সুখ প্রতিদিনের সামগ্রী, আনন্দ প্রত্যহের অতীত। সুখ শরীরে কোথাও পাছে ধুলা লাগে বলিয়া সংকুচিত, আনন্দ ধুলায় গড়াগড়ি দিয়া নিখিলের আপনার ব্যবহার ভাঙিয়া চুরমার করিয়া দেয়। ... সুখ বাহিরের নিয়মে বদ্ধ, আনন্দ সে বন্ধন ছিন্ন করিয়া আপনার নিয়ম আপনিই সৃষ্টি করে।'
খ্যাপা সুখ-প্রত্যাশী নয়, অন্যের তৈরী নিয়মে নিজেকে সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে রাজী হয় না সে।
'যাহা রহিয়াছে, যাহা আছে, তাহাকেই চিরস্থায়ীরূপে রক্ষা করিবার জন্য সংসারে একটা বিষম চেষ্টা রহিয়াছে; ইনি সেটাকে ছারকার করিয়া দিয়া, যাহা নাই তাহার জন্য পথ করিয়া দিতেছেন। ইঁহার হাতে বাঁশী নাই, সামঞ্জস্য সুর ইঁহার নহে; পিনাক বাজিয়া ওঠে, বিধিবিহিত যঞ্জ নষ্ট হইয়া যায়, এবং কোথা হইতে একটি অপুর্বতা উড়িয়া আসিয়া জুড়িয়া বসে।'
অন্যদের 'বিষয়' নিতান্তই 'বাস্তব'। পদার্থবিদ্যার- জড়পদার্থ, তার মধ্যেকার অণুপরমাণু, তাদের গতিময়তা ও টানাপোড়েন, বটানিস্টের- উদ্ভিদ, তার বৈচিত্র, তার জন্ম-মৃত্যু, জীববিজ্ঞানীজীবজগৎ, তাদের ভালবাসা, তাদের বাঁচার নিয়মাবলী। বিষয় জ্ঞাতার বাইরে, তার অস্তিত্ব জ্ঞাতা-নিরপেক্ষ এবং প্রচেষ্ঠা থাকে বিষয় সম্পর্কে জ্ঞাতা-নিরপেক্ষ জ্ঞান অনুসন্ধানের। এ জ্ঞানের রূপ বাক্যবিন্যাসে, যে বাক্য উচ্চারিত হওয়ার আগেই সত্য অথবা মিথ্যা হয়ে যাচ্ছে। কোনো এক সময় ভাষা ছিল না, কিন্তু বিস্ময় ছিল। তারপর এক মহালগ্নে আমরা প্রথম উচ্চারণ করতে জানলাম 'সুর্য', 'পৃথিবী', 'আবর্তন'। প্রথম প্রকৃতিপাঠক বললেন 'সুর্য পৃথিবীকে ঘিরে আবর্তিত হয়'। মিথ্যে হয়েই জন্ম নিল বাক্যটি। (আজকাল অনেকেই এসবে, এই জ্ঞাতা-নিরপেক্ষতায়, সন্দিহান, জানি, তবু তা এখনো সন্দেহেই। ভাবনার মূল কাঠামোয় তেমন কোনো বদল ঘটেছে বলে মনে হয় না।)
বিপরীতে গণিতসাধকের জ্ঞেয় বিষয় তাঁর মনের মধ্যেই, তাঁর কল্পনায়। একটি কাগজে, রুলার দিয়ে একটি রেখা আঁকা হল। গণিতবিদ তার বাইরে অবস্থিত এই বস্তু রূপটিকে অন্য সকলের মতই দেখেন। কিন্তু এটিই তাঁর বিষয় নয়। তাঁর কল্পনায় তিনি এবার রেখাটির বাস্তব প্রস্থকে মুছে ফেলতে ফেলতে তাকে একেবারে সীমায় ঠেলে নিয়ে যান। আবার অন্যদিকে রেখাটি দুদিকেই প্রসারিত করতে থাকেন যে কোনো সীমা অতিক্রম করে। কল্পনার এই খেলায় কাগজের উপরকার বাস্তব, সীমায়িত, প্রস্থবান রেখাটি অন্য রূপ যায়- এ রূপ আর বাইরে নেই, সমস্তটাই গণিতশিল্পীর মনে। এই যে বিষয়কে মনে মনে গড়ে নেওয়া, বাস্তবতা থেকে অবাস্তবতায় প্রসারিত করা, এই কাজে গণিতবিদকে একজন শিল্পী বা কারিগর বলে মনে হতেই পারে। বাইরের বস্তুটি নয়, সেই বস্তুটি বা বস্তুর আভাসটিকে কেন্দ্রে নিয়ে গড়ে তোলা মানসপ্রতিমা; এবং এই গড়ে তোলা গণিতস্রষ্টারই মনের কারুকাজ দিয়ে। নতুন এই রহস্যময়, রূপটিকে এবারে তিনি বরণ করে নেন তার 'বিষয়' হিসাবে এবং যথেষ্ট বিস্ময়ে তাকে, সেই বিষয়কে, পর্যবেক্ষণ করেন। বিষয়টিকে তার রহস্যাবৃত মনে হয় এবং এই রহস্যের উন্মোচন তাঁর কাছে অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
এভাবেই গড়ে ওঠে একটি নতুন রূপ, যা বস্তুত গণিতস্রষ্টার মনেরই সৃষ্টি, যার কাছে স্রষ্টা নিজেই আবার নতজানু, যেভাবে একজন প্রকৃতিবিজ্ঞানী নতজানু প্রকৃতির কাছে।
প্রকৃতিবিজ্ঞানীর সঙ্গে প্রকৃতির একটি খেলা চলে। বিজ্ঞানী এই খেলায় একজন বুদ্ধিমান কল্পনাক্ষম প্রার্থী - প্রার্থী তাঁর বিষয় প্রকৃতির কাছে। গনিতবিদও এই ধরনের এক খেলাতেই লিপ্ত হন। তবে তার খেলার সামগ্রী তিনি গড়ে নেন নিজেই।
( এ সামগ্রী কতটা স্রষ্টা নির্ভর? বাস্তব রেখাটি থেকে উদ্ভুদ এই যে নতুন রূপ, এর মধ্যে কি একটি উনিভার্সালিটি থাকে? সকল সুস্থ কল্পনাশীল মানুষই মনের এই কারিগরিতে পারদর্শী, সকলেই সেই আইডিয়াল রেখা-রূপটি মনের আর্শীতে দেখতে সক্ষম।
প্লেটো বলবেন অন্যভাবে। তিনি বলবেন, এই রূপটিই বাস্তব। The so called real world of experience is not at all real. We are like dwellers in a cave, who perceive the shadows of the external world and mistake the shadow for the real thing. )
তখনই অপরিহার্য হয়ে পড়ে কথা। অন্য বিজ্ঞানী তাঁর বিষয় দেখিয়ে দিতে পারেন, যেমন - এই একটি বৃক্ষ, অথবা এই একটুকরো উল্কাপিন্ড, অথবা এমনকি, এই একটি ইলেক্ট্রন। বিষয় উপস্থাপনার জন্য কথা তাঁর ক্ষেত্রে অপরিহার্য নয়। কথাত ভুমিকা দ্বিতীয় পর্যায়ে, বিষয়-এর জ্ঞানের বাহক হিসাবে।
কিন্তু গণিতের বিষয় মানেই একটি বা কয়েকটি গুনের বর্ণনা - বিন্দু; যার অবস্থান আছে অথচ পরিমাপ নেই; সংখ্যা - কোনো বস্তুসমষ্টির সেই ধর্ম যা পড়ে থাকেই বস্তুগুলি থেকে তাদের সমস্ত বিশেষ গুনাবলী, যেমন রঙ, আকার, গন্ধ বা এমনি সবকিছু, সরিয়ে নিলেও।
কথার মতো শক্তিমান অ-বাস্তব আর কী আছে? কয়েকটি ধ্বনি দিয়ে অথবা চিহ্ন দিয়ে পর পর সাজিয়ে তোলা একট পরম্পরা, একান্তই এবস্ট্রাক্ট গঠন একটি, কঈ মায়ার খেলায় জড়িয়ে ফেলেছে মানুষকে, ধ্বনির গঠন আবার তৎক্ষনাৎ বিলুপ্ত হয়ে যায়।
অন্যদের ক্ষেত্রে বিষয়ের অস্তিত্বের পরেই তার বর্ণনা আসে। এখানে বর্ণনা দিয়েই বিষয়ের সৃষ্টি।
(তুলনা - বিষয় ; মৎসকন্যা = মাছের শরীর, মানুষীর মুখ, জলে ভেসে বেড়ায়।) বাইরে নেই। মনে আছে। ভালবাসায় আছে।
রবীন্দ্রনাথের 'সে' মনে পড়ে? 'পুপে দিদিমনিকে ধারা বেয়ে যে গল্প বলে যাচ্ছি সেই গল্পের মূল অবলম্বন একটি সর্বনামধারী, সে কেবলমাত্র বাক্য দিয়ে তৈরী।'
এই এবস্ট্রাকশন এবং বাণী-নির্ভরতার ফলে axiomatization হয়ে পড়ে গণিতের গঠনপ্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ।
কয়েকটি বাক্য উপস্থিত করা হয় খেলার টেবিলে। ধরে নেওয়া হয় কিছু সামগ্রী আছে যারা ঐ বাক্যে উল্লেখিত গুনাবলির আধার। বেশ ভালো হয় ইতিপুর্বে গঠিত কিছু গণিত-সামগ্রীর যদি ঐ গুনাবলী থাকে। স্বাভাবিকভাবেই, গণিতের ইতিহাসের প্রথম সৃষ্ট axiom-গুলির জন্য ঈপ্সিত আদিম সামগ্রীগুলির প্রামান্য নয়। খানিকটা বোধ বা কান্ডজ্ঞাণের ওপর ছেড়ে দিতে হয় এদের অস্তিত্বকে।
যেমন ইউক্লিডিয় জ্যামিতির axiom-গুলি অথবা পিয়ানোর সংখ্যাসুংক্রান্ত axiom-গুলি। প্রথম গুচ্ছকে ধারন করার জন্য আছে বিন্দু, সরলরেখা ইত্যাদি জ্যামিতির অবাস্তব বস্তুগুলি। আর দ্বিতীয় গুচ্ছের জন্য বিমুর্ত পূর্ণ সংখ্যার দল।
এইভাবেই বাস্তব বস্তু থেকে কল্পনায় এবং তার পরে সে কল্পনার বাণীরূপ। অথবা বাস্তব বস্তুর আভাস থেকে কথা এবং কথা থেকে কল্পনায় এক রূপের অবয়ব গড়ে তোলা।
ঠিক এখানেই সেই পুরনো প্রশ্নটি এসে যায়। কথা ছাড়া মানুষ কী ভাবনা করতে পারে? বাণীহীন অর্থাৎ ভাষা গড়ে ওঠেনি যাদের তারা কি কল্পনা করতে পারে? ভাবতে পারে? অন্তত স্ট্রাকচারড বিমুর্ত ভাবনা? গণিতের মতো ভাবনা?
প্রাথমিক গঠনের পরে যে এবস্ট্র্যাকট রূপটি তৈরি হল তার কিছু নির্দিষ্ট গুনাবলী আসে। এই অবাস্তব বস্তুগুলির 'সত্য কাহিনী' সেগুলি।
সে গুনাবলীর 'আবিস্কার'ও গণিতকর্মির কাজ, দ্বিতীয় পর্যায়ের। এই অনুসন্ধানের জন্য ল্যাবরেটরি সাজাতে হয় তাঁকে - যে ল্যাবরেটরির মূল মন্ত্র হল লজিক এবং পদ্ধতি হল গাণিতিক প্রমানের মধ্য দিয়ে যাওয়া। প্রমানপদ্ধতি মাত্রেই এবস্ট্রাক্ট। সুর্যের আকৃতি গোলাকার - এর প্রমাণ সরাসরি, প্রকৃত তথ্য খোঁজার মধ্য দিয়ে। কিন্তু ত্রিভুজের কোনের সমদ্বিখন্ডক তিনটি একই বিন্দু দিয়ে যায় - একথার প্রমান যুক্তি-তর্ক দিয়ে করতে হয়। এই বিমুর্ত কথা চলাচলের মধ্য দিয়ে যে সিদ্ধান্ত আসে তা এত অমোঘ, এত সন্দেহাতীত মনে হয় কেন - এটা এক বিষ্ময়।
ফলত গণিত জগতের বিচরণকারীর কাজ দ্বিবিধ;
শিল্পী হিসাবে - আশ্চর্য, অসম্ভব, সুন্দর রূপের নির্মাণ।
আবিস্কারক হিসাবে - সেই নির্মিত রূপের অজ্ঞাত গুণাবলীর অনুসন্ধান।
অজ্ঞাত গুণাবলীর আবিস্কারের পদ্ধতিটি আরো একটু খুঁটিয়ে দেখা যাক। Axiom-গুলি দিয়ে রূপ নির্মানের পর নির্মাতার দায়িত্ব মূলত শেষ, যদিও রূপের মুল এককগুলি সাজিয়ে অন্যান্য বিচিত্র মিশ্র রূপ সৃষ্টির কাজেও শিল্পীসত্তাই ক্রিয়াশীল। সীমাবদ্ধ রেখা আর বিন্দু-রূপ দিয়ে যেমন বৃত্ত-রূপ, topological space এবং group মিলিয়ে যেমন topoligical group ।
এরপর আবিস্কারক হিসাবে গণিতকর্মির কাজের শুরু। তিনি তখন একের পর এক সৃষ্ট রূপগুলির গুণনির্দেশক বাক্য (কথার মাহাত্য আবার লক্ষনীয়) উপস্থাপিত করেন এবং প্রশ্ন করেন, এ কি সত্যি না মিথ্যে? সত্যি, মিথ্যে শব্দ দুটি বহির্বিশ্বের জ্ঞানের ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য হয়। গণিতের ক্ষেত্রে বরং বলা ভালো বাক্যটি প্রামান্য না অ-প্রামান্য। এতদিনের বিশ্বাস ছিল একটি অথবা অন্যটি হতে বাধ্য। সম্প্রতি তিরিশের দশকের পর থেকে গ্যেডেলের অসম্পুর্ণতা তত্ত্ব এসে যাওয়ার পরে, একটি তৃতীয় সম্ভাবনাও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন গণিত-পথিকেরা - তা হল প্রামান্য বা অ-প্রামান্য কোনোটিই নয়। তাছাড়া অনিশ্চিতির আরো একটি কারন, গাণিতিক প্রমান পদ্ধিতিতেও বিভিন্নতার উপস্থিতি। একই গাণিতিক রূপ থেকে ভিন্ন ভিন্ন প্রমান
গাণিতিক প্রমান এক জাতীয় পদ্ধতি, বিগত এক শতকেরও বেশি সময় ধরে যার গ্রহনযোগ্যতা এবং মর্যাদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্ঞানের অন্য ক্ষেত্রেগুলিতেও, পদার্থবিদ্যায় তো বটেই, এই পদ্ধতির প্রয়োগ এক লাফে সম্মান বাড়িয়ে তোলে। 'Understanding means understanding through mathematics', গণিতের অপর নাম র্যাশনালিটির অপর নাম গণিত। সকলেই জানেন অধিকাংশ গণিতজ্ঞের আচরন অস্বাভাবিক তবুও।
ফলে 'বিজ্ঞানের রানী' যে কোনো অন্য জ্ঞানের 'পরিচারিকা' ইয় পরিনতিলাভ। Non-standard analysis-কে অধ্যাপক William F. Tayor কি চোখে দেখেন তার নমুনাঃ That subject looks very interesting to me, and I wish I could take out the time to master it. There are numerous places in my field where one is confronted with the things that are going on simultaneously at totally different size scales. They are very difficult to deal with by conventional methods. Perhaps non-standard analysis with its infinitesimals might provide a handle of sort of things.
টেলর ইঞ্জিনিয়ারিং-এর একজন প্রথম সারির ব্যাক্তিত্ব। কোনো আশ্চর্য গণিতাংশকে প্রায়ই এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় - 'কী হবে এ দিয়ে?'
প্রশ্ন হয় না ; 'কেমন লাগছে একে?'
কেন? কেন গণিতের অন্য নাম র্যাশনালিটি? 'Quantitative science - that is science with mathematics - has proved successful in controlling nature. The majority of the society backs it up for this reason. At the present moment, they want nature to be altered and controlled - to the extent, of course, that we can do it and the results are felicitous. The humanist point of view is a minority point of view. But it is influencial - one sees this among young people' - ১৯৭৭ - এর আগস্ট মাসে অধ্যাপক টেলরের এই সাক্ষাৎকার। আমি আরো লক্ষ করতে বলি ঐ 'humanist point of view' শব্দগুচ্ছকে।
কে কথা বলছে? ক্ষমতা। মেজরিটি প্রকৃতপক্ষে - ক্ষমতাবান গোষ্ঠী, অথবা মেজরিটির অর্থ গতানুগতিকতা। টেলর-এর কাছে সুন্দর তখনই যখন তা কোনো ব্যবহারে লাগে। গণিত সুন্দর ততক্ষনই, রানী ততক্ষনই যতক্ষন তা ব্যবহার্্য।
গণিতকে বেরিয়ে আসতেই হবে এই স্তাবকতার তাহ থেকে, স্তাবকতার আড়ালে লুকোনো লোভী দৃষ্টি থেকে। বিজ্ঞাপন, বাজার, ব্যবসা ও ব্যবহারের বাইরে থেকে তার নিজের, শুধুমাত্র সৈন্দর্যের কোণতিতে তাকে ফিরতেই হবে। ব্যবহারিকেরা আসুন সবিনয়ে, মুগ্ধতা নিয়ে, এবং ভালোবেসে।
সমস্ত জ্ঞানের পদ্ধতির চুড়ান্ত শুদ্ধ রূপ গাণিতিক পদ্ধতি - এই বোধ ও বিশ্বাসে একটু ভাঙন ধরেছে ইদানীং। এর অন্যান্য কারনের মধ্যে, আমার মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ অন্যতর হল, প্রচলিত গণিতের ভিত্তি ও পদ্ধতিতে গণিতের অন্তর্জগত থেকেই উদ্ভুত সন্দেহ। এই সন্দেহের মুখে দাঁড়িয়ে গণিত এতদিনকার অদ্বৈততা হারিয়ে ফেলছে। সে শতধারায় বিভক্ত- আমি বলতে চাই বিকশিত। বিকল্প গণিতেরা দাবি নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। মূল স্রোতটি অবশ্যই অদ্বৈততার রক্ষক, কারণ স্পষ্টতই পায়ের তলার ভূমি। আর বিভিন্ন ক্ষীণ, অতিক্ষীণ, বিদ্রোহী, অবার্চীন ধারাগুলির ক্রমাগত আবির্ভাব। কা বাঁচে কে হারায় সে প্রশ্ন এই ক্ষণে অর্থহীন। ধারাগুলি যেন স্বাভাবিক পরিণতি পেতে পারে- সভ্যতার দায়ে এটুকুই হওয়া উচিত। তাকে যেন স্বাভাবিক জল-হাওয়া থেকে বঞ্চিত না করা হয়। এ দায়িত্ব পালন করছে কই সভ্যতা? আর এই যে যেটুকু আত্মপ্রকাশনার সুযোগ পাচ্ছে বিভিন্ন বিকল্প গণিত তার পিছনেও ঐ ব্যবসা- এবং ভবিষৎ ব্যবহার্যতার সম্ভাবনা- আমার বিশ্বাস তাই।
আমার কাছে একটা দায় এসে পড়ে। 'আকাশকুসুম' রচনার অধিকার প্রতিষ্ঠার দায়। গণিতের মূল ধারা আকাশকুসুমকে স্বীকার করেও তার আকার-বর্ণ গন্ধের সীমানা সুনির্ধারিত করে দেয়। তাই অস্বীকার এই মূল স্রোতকে। আর রাষ্ট্র-সমাজ-ব্যবসা-টেকনোলজি-উপযোগিতার নিক্তিতে মাপছে সব কিছু। অবার্চীনতার সামান্য স্থান এখানে। অস্বীকার তাকেও, সে কারণে।
বস্তুত ক্রমাগত আকাশকুসুম রচনা করে করেই এই অস্বীকারের একটা বাস্তবতাও তৈরি হবে।
সমাপ্ত
Subscribe to:
Posts (Atom)